বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর

 

বিদ্যাসাগ আর দয়ার সাগর – I

এই গল্প’টিতে নায়ক হচ্ছে ক্ষুদে দুই জন – কাবুল আর টাবুল; জ্যাঠ তুতো – খুড় তুতো ভাই তারা, একই বাড়ি’তে থাকে…কাবুলের মা টাবুলের জেঠইমা; কাবুল টাবুল এর থেকে দুই বছরের মতো বড়…ভারি গলায় গলায় ভাব দুজনাতে…স্কুল থেকে ফিরে আসতে যতটুকু দেরী, তার পরে বলা যায় দুজনে অবিচ্ছেদ্য…একসাথে মাঠে খেলতে যায়, সেখানে না যেতে পারলে নিজেদের তিন তলা বাড়ি’র বড় ছআদে তারা ঘনটা ভর আপন মনে খেলায় মেতে থাকে…ছাতের কোনায় একটেরে চিলে কোঠা’র ঘর খানা তাদের ভারি পছন্দের জায়গা…অত রকম বাতিল বা বাড়ির বাড়তি জিনিষ পত্র’এর পাহাড় এ ওরা তাদের কল্পনা’র লাগাম ছুটিয়ে নানা খেলা বার করে, এক পাশে পুরানো লেপ-তোষক-জআজিম-ঢিপি করে রাখা…কখনো সেটা রূপ কথা’র পাহাড়, যা পেরিয়ে ও পাশে পৌঁছাতে পারলেই `রাজ পুত্র’ শর্তে জিতে যাবে, ডাইনী আর ধরতে পারবে না, কখনো বা সেটা ঢালু বেয়ে নীচে নামার প্রতিযোগীতা’র চেহারা নেয়, দাদা যা বলে, প্রায় বিনা তর্কে টাবুল মেনে নেয়…ভাবের বহর দেখে মাঝে মাঝে দু জনা’র মা হাসেন…আবার কখনও বেশি চুপ-চাপ থাকলে একজন কেউ উঠে আসেন খোঁজ নিতে, কী করছে দুটো ভাই মিলে…এভাবে দিন কাটে…

 

বিদ্যাসাগ আর দয়ার সাগর -II

সকালে মাস্টার মশাই দু ভাই ‘কে এক সাথে পড়আ-তে আসেন; টাবুল ছোট, ক্লাস ফোরের পড়া শেষ হতে কত ই বা সময় লাগে! দাদা’র জ্ন্য সে অপেক্ষা’য় থাকে, কাবুল এর পড়া শেষ হতে বেশি সময় যায়, তাই সকালে ওদের হাতে খেলবার বা নিজেদের মধ্যে কথা বল বার সুযোগ বড় একটা হয় না…স্যার চলে যাবার পরে স্কুলে যাবার তাড়া, স্নান করা, খাওয়া, ব্যাগ গুছিয়ে প্রায় দৌড় দেবার অবস্থ্যা…একটা দুটো কথা নিজেদের মধ্যে বলে কখন! সব সময় মা বা জ্যাঠাইমা সামনে, খালি তাড়া দিতে থাকেন…তাই ওরা বিকেলে ছাতে খেলার সময়’এর দিকে প্রায় চেয়ে থাকে…সামনে তো বড়’রা থাকেন না তাই মনের সুখে তারা নিজেরা নিজেদের মতো কথা-বার্তা চালাতে পারে… বাবা জেঠউ এরা অপিস থেকে এসে পড়েন…তাই তাঁদের জল খাবার এর ব্যাবস্থা করা, কথা বলা এসবে মা-এঁরা খুব ব্যাস্ত থাকেন… তার ওপরে যদি পাড়া পড়শী কেউ দেখা করতে এসে পড়েন, তা হলে তো কথাই নেই… শনি বা রবি বার হলে সিনেমা চলে টিভি’তে, বাচ্চাদের ফিল্ম না হলে কাবুল-তাবুল’দের ডাক পড়ে না, তাই সে সময় টা ওদের বেশ সুখের সময় … অনেক ক্ষণ ধরে এক টানা খেলা করতে ওরা পারে

 

বিদ্যাসাগ আর দয়ার সাগর –III

…স্কুলে যাবার সময় কাবুল তাবুল বাড়ি’র গনেশদা’র সঙ্গে যায়; সেই ওদের দিয়ে আসে আর নিয়েও আসে…বাড়ি’র বাজার দোকান করা, বড়’দের ফুট – ফরমাশ খাটা এসব কাজের মধ্যে সময় সময় সে ওদের দুই ভাই’এর খেলার সঙ্গী’ও হয়, তবে সে সুযোগ কমই পাওয়া যায়…পাড়া’র মধ্যে বাজার এর কাছে বিদ্যাসাগর ইন্স্টিট্যূশন ‘এতে দুই ভাই পড়ে…স্কুল টা ভালো, বাংলা মিডিয়ম হলেও মোটামুটি সুনাম আছে এ ছাড়া বাড়ি’র কাছে বলেও বাবা-জ্যাঠা এখানেই দু জনা’কে ভ্র্তি করে দিয়ে ছেন…তারা খুব খারাপ করছেও না…তবে উঁচু ক্লাসে উঠতে বাকি তো আছে, তাই এ নিয়ে কেউই অত কিছু চিন্তা করেন না

আজ স্কুল থেকে দু জনে ফিরে রোজ কার মতো বই খাতা রেখে, হাত মুখ ধোয়া, জল খাবার খাওয়া এসব পর্ব চুকিয়ে ছতে উঠে এসেছে; ক্লাসে তাবুলের এক বন্ধু’র জন্ম দিন ছিল, সে দুটো চকোলেট পেয়েছিল…তখনি সে খায় নি, পকেটে করে নিয়ে এসেছে দাদা’কে দিয়ে খাবে বলে..ছোট ভাই’এর হাত থেকে খুশি  হয় মুখে সেটা পুরল কাবুল…এবারে নিজের টা গালে দিয়ে তাবুল তাদের বল ব্যাট এ সব রাখার জায়গা’ সেই চিলে কোঠা’য় ঢুকল…পেছন পেছন কাবুল ও এল…কোঠা’ খানা বেশ বড় কিন্তু বলতে গেলে মেঝে থেকে প্রায় ছআত পর্যন্ত নানা জিনিষ’এ বোঝাই…থেকে থেকে ওরা নিজে দের মধ্যে (অবশ্য ই বড় দের কানের নাগালের বাইরে) বলা বলিকরে – `বড় রাও কত বাজে জিনিষ পত্র জমা করে রাখে, দেখেছিস! খালি আমাদের কে বলে বাজে জিনিস জমিও না, ফেলে দাও’!

 

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর –IV 

…ট্‌ফি খাওয়া শেষ করে দুই ভাই তাদের প্রিয় বল খেলা শুরু করে; চাটের দুই দিকে গনেশদা তাদের খেলা’র জন্য চক দিয়ে গোল পোস্ট এঁকে রেখেছে, এখানে তারা খেলতে খুব পচ্ছন্দ করে; স্কুলের মাঠে খেলবার উপায় আছে! এত জনে বল নিয়ে টানা টানি করে, মারা মারি ও লেগে যায় তাই ওরা বাড়ির চটেই শান্তি’তে খেলে নেয়…কিন্তু আজ  তাবুল লক্ষ্য় করছে – কাবুল কেন যেন মন দিয়ে বড় একটা খেলছে না, কিছু যেন একটা ভাবছে …`না, আর খেলতে ভাল লাগ্ছে না’ বলে সে খেলা থামিয়ে দেয়… খানিক চুপ করে দেখার পর তাবুল আর থাকতে না পেরে প্রশ্ন করে – `কী ভাবছিস রে, দাদা?’ দু জনে এসে চিলে কোঠা’র মধ্যে পড়ে থাকা একটা পুরনো আর বাতিল ত্ক্তপোশে বসে…সেটার একটাপা-ভাঙ্গা, অন্য আরেক টা পায়া নড়বড়ে, তাই খুব সাবধানে ওরা জায়গা বুঝে বসে…তাবুল আবার তাড়া দেয় – `বল না, কী হএছে’? কাবুল এবারে আস্তে আস্তে উত্তর দেয় – `সামনের সপ্তআহে বলাই স্যার’এর ক্লাস টেস্ট আছে রে, তাই…’ এবার দাদা’র চিন্তা’র কারণ বুঝতে পারে তাবুল…বলাই স্যার ওদের স্কুলের গেম্‌স টিচার, খুব শ্ক্ত-পোক্ত চেহারা আর বাংলও উনি বাংলা ও নীচের দিকের ক্লাস গুলো’তে পড়ইয়ে থাকেন, খুব রাশভারি চেহারা আর সবাই বলা-বলি করে, পচ্ছন্দ মতো না হলে ছাত্র’দের কখনো কখনো এক দুই ঘা বেত মারতে খুব তিনি পেছ-পা হন না…ওই বেত দুই ভাই-ই খেলার মাঠে কারুর কারুর  পিঠে পড়তে দেখেছে… তাই দাদা’র চিন্তা’র কারণ জানতে পেরে তাবুল নিজে ও খুব উদ্বিগ্ন হয় পড়ে…

`কী করবি রে তুই?’ কাবুল বলে – `তাই ভাবছি, যদি কোন ভাবে জানতে পারতাম, উনার প্রশ্ন পত্র ‘তে কিসের ওপর আসবে, কী যে ভাল হোত, সেটাই খুব ভাল করে ঝালিয়ে নিয়ে যেতাম, এক মাসে তো অনেক কিছু পড়আ দাদা’র সঙ্গে তাবুল সব বিষয়ে এক মত, এ বারে’ও তার কোন আলাদা হল না…

 

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – V

…দাদা’র মুখের দিকে তাকিয়ে খানিক ভাবল তাবুল…আচ্ছা! আমাদের মাস্টার মশাই’কে একটু জিগ্গেস করতে পারিস্ না? কাবুল যে তা করে নি, তা নয়; আজই সকালে পড়ানো’র শেষে সে একটু কিন্তু কিন্তু করে তাঁকে বলাই স্যার’এর বাংলা পরীক্ষা’র কথা তুলে ছিল; জানতেও চেয়ে ছিল কোন `সাজেশনস’ উনি যদি দেন…ভবেশ বাবু স্থির চোখে ওর দিকে একটু তাকিয়ে গমভির গলায় উত্তর দিয়েছিলেন – `যা তোমায় পড়আনো হএছে, ভাল ভাবে তা অভ্যাস করো, সাজেশনস এর কোন দরকার নেই’…এর পর আর কিছু বলতে কাবুল এর সাহসে কুলায় নি…ছোট ভাই কে সে কথা খুলে বলতে লজ্জাই পেল কাবুল; তাই সে জবাব দিল – `ওতে কিছু হবে না রে, বড়’রা আমাদের কথা ঠিক বুঝতে চায় না’ 

   আবার খানিক ক্ষণ চুপ চাপ; কারুর থেকে যদি একটু সাহায্য পাওয়া যেত! হঠাত্ তাবুল’এর মুখ আশা’য় উজ্বল হয় উঠল…সব বড়’রা এ রকম নিশ্চয় ই নন, এই তো তাদের বলা হয় বিদ্যাসাগর মশাই নিজে ছোট’দের খুব ভাল বাসতেন…উনার মন’কে ফুলের মত কোমল বলা হয়, উনি নাকি কারু’র কষ্ট দেখলে বা সে অসুবিধেয় পড়েছে দেখলে যে কোন ভাবে সাহায্য করা’র চেষ্টা করতেন! তা হলে দাদা’র এই বিপদে কী উনার কাছে সাহায্য পাওয়া যাবে না? সে কাবুল কে বেশ জোর দিয়ে বলে উঠল `’ওঁরা তো বলেন – খুব মনযোগ দিয়ে এক মনে ডাকতে থাকলে ঠিক সাড়া দেন ঠাকুর…আমরা তো উনার স্কুলের’ই ছাত্র, তুই বিদ্যা সাগর মশাই’কে ডাক, নিশ্চয় ই তিনি তোকে বলে দেবেন’…কোথাও কোন আশা’র কিচ্ছু নাদেখতে পেয়ে কাবুল এত ক্ষণ মুখখানা ছোট করে বসেছিল…ভাই এর কথা’য় ওর মনেও একটা আশার আলো জ্বলে উঠল…সত্যই তো, এটা তো তার মাথা’য় আসে নি…ওদের স্কুলে তো সব সময় বিদ্যাসাগর মশাই’ কে দয়ার সাগর বলা হয় থাকে, উনি হয়তো রাগ – টাগ না করে ওকে বলে দেবেন কী প্রশ্ন বলাই স্যার করতে যাবেন, তা হলে আর কোন চিন্তার’ই কিছু থাকবে না!

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – VI

…খুশি মনে দু ভাই মিলে এবারে কোথায় আর কখন বিদ্যাসাগর মশাই কে ডাকা যায়, তার আলোচনায় মেতে  উঠেছে…`কোথায় বসি, বল তো? বেশ একটু সময় লাগবে, ডাকতে শুরু করলেই তো আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি এসে যাবেন না, বড়দের তো অনেক হাতে কাজ থাকে’…কাবুল এর এই প্রশ্নে তাবুল একটুও সময় নষ্ট না করে বলল – `কেন, আমাদের এই চিলে কোঠা’র ঘর টাতে?’ এটা কাবুল এর খুব মনে ধরল; অন্য কোথাও ওরা দু জনে খানিক ক্ষণ বসে কিছু করলেই বড়’রা দেখে ফেলবেন আর বড়’দের যা স্বভাব! শুধু তো প্রশ্নের ‘পর প্রশ্ন’ই করবেন, তা না, অকারণএ হয় তো বকুনি শুনতে হবে…চিলে কোঠা’ই তাই ভাল…সবাই জানে – ওরা দু জনে ওখানে খেলা ধুলো করে, খানিক বেশি সময় লেগে গেলেও কেউ অত খোঁজ করবে না`

ডাকতে গেলে কী কী জিনিষ লাগবে রে, দাদা?’ তাবুল এর কথা’য় কাবুল সোজা হয় বস্ল…একটা ছবি, সে তো আমাদের পড়া’র ঘরে’র দেয়ালে’ই আছে, গনেশ দা’কে বল্লেই খুলে এনে দেবে এখানে…একটা ধুপ্ কাঠি, একটা টুল, যার ওপরে ছবিটা রাখা হবে, ব্যাস, আর কী! দু ভাই খুব খুশি মনে নীচে নেমে গেল; রাতের খাওয়া-দাওয়া চুকে গেলে যে যার মা’এর কাছে শুতে গেছে…তাবুল মা’এর হাতে’র একটু মাথা বুলানো না পেলে ঠিক ঘুমোতে পারে না…মা তার কাছে বসে তাই ওর চুলে কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, প্রায় ঘুম এসে গেছে, আধ জাগা আধ বোঁজ আ গলা’তে সে মা’কে প্রশ্ন করে বসেছে – মা,

বিদ্যাসাগর মশাই খুব ভাল ছিলেন, না?’ মা তো অবাক! `কেন রে?’ `না, দাদা’র না বলাই স্যার’এর ক্লাস পরীক্ষা নিয়ে খুব চিন্তা’ তার পরের কথা গুলো প্রায় আর শোনা গেল না `উনা’কে জিগ্গেস করব আমরা কাল…তাবুল ঘুমিয়ে পড়েছে!

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – VII

ছেলে তো ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু তাবুলের মায়ের মনে চিন্তা শুরু হয় গেছে – `কী ব্যাপার, বাচ্চা দুটো কী করতে যাচ্ছে?’ যে কোন বিষয় হক না কেন,  কাবুলের মা’কে উনি না জানিয়ে পারেন না…রান্না ঘরে গিয়ে তিনি গিয়ে তাঁকে বল্লেন – `দিদি, দুটো বাচ্চা মিলে জানি কী কান্ড করতে যাচ্ছে!’ তাবুলের জ্যাঠাই-মা ভুরু একটু তুলে স-প্রশ্ন চোখে তাকালেন – `কেন, কী হল তোর’? সব শুনে তিনি তো হেসে’ই উড়ইয়ে দিলেন – `যা, বাচ্চা’রা একটু নিজেদের মতো করে খেলবে, বিদ্যাসাগর মশাই কে ডাকবে, তা নিয়ে ও তুই চিন্তা করবি’? খেলুক না ওরা’…না দিদি, তাবুলের মা ছাড়া’র পাত্রী নন; `ভেবে দ্যাখো, ওই চিলে কোঠা’য় একলা…’ কথা শেষ হবার আগেই বড়-জআ হাত তুলে হাসি মুখে তাকালেন – `কিচ্ছু ভাবিস্ না’…দিদি’র মুখে আত্ম-প্রত্যয়’এর হাসি দেখে এবার যেন একটু শান্তি পেলেন তাবুলের মা

পরের দিন সকাল থেকে’ই কাবুল আর তাবুল ত্ক্কে ত্ক্কে রয়ছে, গনেশ’কে কখন একটু বড়’দের ফাই-ফরমায়শ খাটা’র ফাঁকে আলাদা করে ধরতে পারবে! বাড়ি’তে বাবা-কাকা এঁরা থাকলে বা এই সব হ্পতা’র শেষ দিকে শনি-রবি বার গুলো’তে যেন গনেশ-দা চরকি’র মতো পাক দিয়ে ফেরে, তাকে কাছে পেতে আর নিজেদের দরকারী জিনিষ গুলো তাকে দিয়ে গুছিয়ে নিতে নিতে প্রায় দুপুর পার হয় গেল… ওদের খাওয়া হল, মা-এঁরা খাওয়া দাওয়া’র পাট চুকিয়ে একটু গড়ইয়ে নিতে গেলেন…তার পরে দুই ভাই তাদের সেই দরকারের জিনিষ গুলো নিয়ে আর প্রায় গনেশ-দা’র হাত ধরে টানতে টানতে চিলে কোঠা’র ঘরের দিকে নিয়ে গেল

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – VIII

সব গুছিয়ে দেবা’র পর ধুপ্ কাঠি জ্বেলে দিতে তবে গিয়ে গনেশ ছুটি পেল; সে অবশ্য বড়-মা’কে নানান কাজের ফাঁকে চট করে জিগ্গেস করে নিয়ে ছিল, তিনি খুব সহজ ভাবে `হ্যাঁ’ বলে দিয়ে ছিলেন; তাই গনেশে’র পরে বকুনি খাবার কোন ভয় ছিল না; কেবল তিনি ওকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে ছিলেন – আগুন বা দেশলাই যেন সে কোন মতে ছোটো দের হাতে না দেয়, তাই সে নিজে ধুপ্ কাঠ-ই জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছে…তার সঙ্গে বাচ্চা দের যেন মশা না কামড়ে দেয়, সে জ্ন্য একটা কচ্ছ্প – ছাপ ধুপ্ এর `কয়ল’ও জ্বেলে দিয়ে এসেছে…

গনেশ চলে যেতে কাবুল উঠে দরজআ তা ভেজিয়ে দিল; ছআতের ঘর টা এমনিতেই একটু একটেরে, এখন যেন একেবারে বেশি চুপ চাপ হয় পড়ল…অন্যান্য দিন এরা খেলা ধুলো নিয়ে থাকে, এসব নিয়ে চিন্তা করবার সময় পায় না. এখন এটা যেন ওদের কেও অস্বস্তি দিচ্ছিল; মনে জোর টেনে এনে কাবুল তাবুল কে নিয়ে এবার ছ্বি’র সামনে হাত জোড় করে চোখ বুঁজএ ব্সল…তাবুল একটু পরেই তার দাদা’কে জিগ্গেস করল, দাদা, উনি রাগী ছিলেন না তো? এ চিন্তা যে কাবুল এরও মাথায় আসেনি তা নয়; ওর ও মনে হয়ছে – যদি বিদ্যাসাগর মশাই এসে বকা-বকি করেন? ভাই ‘এর সামনে তাও সে সাহস দেখিয়ে অন্য কথা বলে – `না রে, উনাকে তো দযার সাগর বলা ও হোত, মনে হয় না আমাদের ওপরে রাগ করবেন’…একটু যেন মনে বেশি জোর পেল তাবুল; দাদার দিকে আরও একটু বেশি করে পাশ ঘেঁষে সে বসে হাত জোড় করল

একটু পরেই ঘরে `ক্চ’ করে একটা শব্দ শোনা গেল; `এসে গেছেন রে দাদা’ বলে উঠেছে তাবুল. একটু অ-প্রস্তুত গলাতে কাবুল উত্তর দিল – `না রে, আমি একটা পেয়ারা কামড়ে ছি’; একটু বিরক্ত হোল তাবুল – এই কী পেয়ারা খাবার সময়? এত বড় কারুর সঙ্গে এ ভাবে কী কথা বলে? ল্জ্জিত হয় কাবুল সেটা সরিয়ে রেখে আবার চিন্তা’য় মন দিল

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – IX

আরও  খানিক পরে দরজাতে একটা যেন শব্দ হল; দু ভাই একসাথে চোখ খুলেছে; একজন কেউ যেন বড় চাদর গায়ে জড়ইয়ে সামনে দাঁড়িয়ে; উত্তেজনা’য় প্রায় এক সাথে দু জনে উঠে দাঁড়িয়েছে…`আপনি কে?’ কাবুলের গলা একটু কেঁপে গেছে; ভারি গলায় উত্তর এল `তোমরা তো আমায় ডাকছিলে, তাই না?’ আপনি-ই বিদ্যাসাগর মশাই?’ একটু কাশি’র সঙ্গে উত্তর এল `হ্যাঁ’…চাদরে ঢাকা মূর্তি’টি এবারে একটু নড়ে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল – `বল, কেন আমায় ডেকেছ তোমরা?’

হয় তো বা একটু ঘাবড়ে গিয়েছে বলে বা উত্তেজনায় প্রথমে কাবুল’এর মুখে কোন কথা সরছিল না; টাবুল ই একটু মরীযা হয় বলে ফেল্ল – `দাদা’র পরীক্ষা’ নিয়ে খুব ভয়, বলাই স্যার তো…’ কথা শেষ হবার আগেই মৃদু যেন একটা চাপা হাসি’র আওয়াজ পাওয়া গেল; দুই ভাই-ই এতে ভারি অবাক হয় – `বলাই স্যার’এর কথাও ইনি জানেন!’ তার পরে ভাবে – `এত বড় উনি, সব খবর তো উনি রাখবেন’ই’…এত ক্ষণে কাবুল এর মুখে কথা ফুটেছে – `যদি পরীক্ষা’তে ওই স্যার কী প্রশ্ন করবেন, তা জানতে পার তাম ; চাদরের নীচে থেকে প্রশ্ন এল – `উনাকে এত ভয় পাও কেন? তুমি কী পড়া ওঁর ঠিক মতো কর না? ক্লাসে দুষ্টু’মি কর?’`না, না, ‘ তড়-বড় করে কাবুল বলে উঠেছে – `উনি যে বড় রাগী, বেত নিয়ে সব সময় ঘোরেন, তাই ভয হয়, পড়আ জানা থাকলেও কী রকম যেন গুলিএয় যায়’!

এবারে উত্তর এল – `তুমি যদি উনার আগের শেখান লেসন্স গুলো ভালো করে লিখে ঝালিয়ে নাও, আর তার পরে পরীক্ষা দিতে যাও, দেখবে তুমি খুব ভাল করবে’; অ-কারণ ভয় কে মনে প্রশ্রয় দিও না; তবে শুধু চোখ বুলিএ গেলে কিন্তু হবে না. এছাড়া একটু ঘুরিয়েও একই প্রশ্ন দিতে পারে, লিখে তৈরি হলে সে ভয়’ও তোমার কেটে যাবে; তুমি খুব ভাল করবে তা হলে পরীক্ষা’তে!

একটু চুপ চাপ কাট্‌ল; এবারে দুই ভাই শুনতে পেল – `তা হলে আমি এবারে আসি? তোমরা একটু চোখ বোজ’… দুই ভাই কথা মতো চোখ বুজেছে; হাত তখনও জোড় করে রেখেছে… হঠাত খুব জোর একটা কাঠ বা খাটের সঙ্গে ধাক্কা খাবার শব্দ, আর তার সঙ্গে ব্যাথা পেলে যেমন লোকে কাতরে ওঠে, সেই রকম কথা খুব পরিচিত্ গলা’য় ভেসে এল – `বাবা রে বাবা! এই এক পা-ভাঙ্গা খাট হএছে, তলা’য় ঢোকাও গেল না, হাঁটু দুটো বুঝি গেছে’!

চমক ভেঙ্গে দুই ভাই লাফিয়ে ওঠে; `বিদ্যাসাগর মশাই তো মিলিয়ে যাবেন! খাটের তলা’য় ঢুকতে যাবেন কেন’? চোখ খুলে দেখে কী – চাদর সামনে মাটিতে পড়ে, আর টাবুলের জ্যাঠাইমা দু হাতে তাঁর হাটু চেপে ধরে বসে; আবার শুনতে পেল – `নে হাঁ করে দেখছিস কী তোরা? ধরে তোল আমায়’; দু জনে লজ্জআতে লাল হএ তাঁকে তুলে ধরে দিয়ে’ই তীর বেগে সিঁড়ি’র দিকে দৌড় মেরেছে; সিঁড়ি’র মুখে গনেশ দা দাঁড়িয়ে; প্রায় তাকে ঠেলে দুই ভাই সিধে নীচে `এ তো তাদের বিদ্যাসাগর নয়’ই, আর ইনি নিশ্চয দযার সাগর ও হবেন না, অন্ততঃ হাঁটু’তে চোট খাবার পর! তাই দুরে থাকাই ভাল!

 

(স্মৃতির অনু-লিখন সমাপ্ত)

 

 

Advertisements