মহা ঋষি কুতুক ও `নির্মোক নৃত্য’ (The Great Sage Kutuk and a Dance)

আজ মহা ঋষি কুতুক’এর গল্প শোনাই; এটি ও পরশু রামের লেখা একটি রম্য রচনা; এই গল্প’টির নাম যত দূর মনে পড়ছে – ছিল `নির্মোক নৃত্য’. মা’কে জিগ্গেস করে জানতে পেরে ছিলাম –…

Source: মহা ঋষি কুতুক ও `নির্মোক নৃত্য’ (The Great Sage Kutuk and a Dance)

মহা ঋষি কুতুক ও `নির্মোক নৃত্য’ (The Great Sage Kutuk and a Divine Dance)

আজ মহা ঋষি কুতুক’এর গল্প শোনাই; এটি ও পরশু রামের লেখা একটি রম্য রচনা; এই গল্প’টির নাম যত দূর মনে পড়ছে – ছিল `নির্মোক নৃত্য’. মা’কে জিগ্গেস করে জানতে পেরে ছিলাম – ` নির্মোক ‘ মানে আবরণ বা আচ্ছাদন (covering).

গল্পের শুরু’তে আছে মর্ত্য লোকে থেকে সদ্য় ঘুরে আসা নারদ-মুনি’র কাছে নানা বিবরণ’এর মধ্যে দেব রাজ ইন্দ্র এক জন ঋষি’র খুব ক্ঠিন / উগ্র তপস্যা’র কথা জেনে দুশ্চিন্তআ’য় পড়ে গেছেন; তাঁর নাম মহা ঋষি কুতুক. সিংহাসনে চিন্তিত মুখে তিনি হেলে বসে সখা মাতলি’র সঙ্গে নিম্ন স্বরে শলা-পরাম্র্শ করতে লেগে পড়েছেন. এটা অব্শ্য নতুন কথা কিছু নয়; যখনি এ রকম কোন মুনি ঋষি’র উগ্র তপস্যা’র খোঁজ – খবর আসে, দেব রাজের এই এক চিন্তা ক্লিষট মুখ দেখা যায়; তাই মাতলি প্রথমে এটা’তেও কোন গুরুত্ব দেন নি. সখা’কে শান্ত / নিশ্চিন্ত থাকতে পরামর্শ দিয়ে ছিলেন. কিন্তু ভ্বি তো ভোলা’র নয়! নমীচি’র ঘটনা এক বার হয় যাবার পরে এ রকম কোন খবর পেলেই শংকিত হয় পড়েন; খুব দোষ দেয়া যায় না, সিংহাসন সামলানো বলে কথা!

*   *   *   *   *

এ দিকে দেখতে গেলে দেব রাজের শুধু একটা ঝামেলা না কী? অপ্সরা, স্বর্গ এর অন্যান্য সুন্দরী ‘দের নিয়েও  কী কম হ্যাপা সামাল তাঁকে দিতে হয়! একটু সুনাম হলে পরে’ই আর দেখতে হয় না, গুমোর’এর ঠেলা সামলে ওঠা দায় হয় পড়ে; কোন কাজ চাইলে তাদের দিয়ে পাওয়া যায় না.  ম র্ত্য লোকে তাদের মধ্যে বেশির ভাগ ই যাবার নামে ঠোঁট বাঁকায়, মেনকা-রম্ভা-উর্ব্শি এদের তো ধরা-ছোঁয়া’ই যায় না, তৃতীয় জন তো বলে’ই রেখেছে যে সে ম র্ত্য লোকে আর যেতে চায় না. অবশ্য সত্যি বলতে কী – সেখানে কাউকে পাঠা’তে ইন্দ্রের ও আর ততো ভরসা হয় না. মেনকা একবার, উর্ব্শি একবার দীর্ঘ কাল কাটিয়ে তবে গিয়ে ফিরে আসতে পেরে ছিল; তা’র চেয়ে যদি কোন ভাবে মহা ঋষি কুতুক’কে স্বর্গ লোকে কোন ভাবে ডাকিয়ে এনে খুশি করে ওই সব কঠইন কাজ থেকে মনযোগ হঠিয়ে দেবার কোন উপায় করা যেতে পারে, বেশ হয়!

এই রকম কথা-বার্তা যখন চলছে,  স্নানাহার সেরে শ্রী নারদ ঋষি আবার দেব রাজের সমুখে উপস্থিত হলেন – কী ঠিক করলেন, দেব রাজ?’ নারদের প্রশ্নে খানিক কিন্তু কিন্তু ভাবে ইন্দ্র উত্তর দিলেন – `ওই কথাই হচ্ছিল, মনে ভাব ছিলাম কী, কোন ভাবে যদি মহা ঋষি কুতুক’কে স্বর্গে নিয়ে আসা যেত; মড়ত্য লোকে উর্ব্শি যেতে বড় একটা চায় না, আর আমরা সবাই সামনে উপস্থিত থাকলে হয়ত সুবিধে বেশি হতে পরে’; দেব রাজের কথা শেষ হতে না হতে’ই নারদ বলে উঠে ছেন – `এ আর এমন কী বেশি কথা? আমি নিজে আপনার হয় ঋষি’কে স-বান্ধবে নিমন্ত্রণ করে আসব. উনি আমার কথা ফেলতে পারবেন না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন’

ঋষি নারদে’র থেকে এত বড় একটা সাহায্য পাবার প্রতিশ্রুতি এত সহজে পেয়ে দেব রাজের মুখ আনন্দে উজ্বল হয় উঠল – আমায় বাঁচালেন মুনি বর; কী ভাবে যে এগুব, তা ঠিক করে উঠতে পার ছিলাম না. তার পরে এটা ঠিক হল যে – দশ দিন পরে যে পূর্ণিমা রাত আসছে, সেই রাতে উর্ব্শি’র নাচ দিয়ে মহা ঋষি কুতুক (আর তাঁর সঙ্গে আসা অন্য অতিথি’দের ও) দেব রাজ সম্বর্ধনা জানাবেন!

ইন্দ্র নিজে গিয়ে উর্ব্শি কে প্রস্তুত হতে বললেন – `দেখ, যেন ঋষি’কে যথার্থ রূপে কাবু করতে পার’; আত্ম-প্রত্য’য়ের হাসি হেসে উর্ব্শি জানতে চাইলেন – `যে বা যাঁরা আসছেন, তাঁরা পুরুষ তো?’ ইন্দ্র উত্তর দিলেন – `শুধু পুরুষ নয়, মহা পুরুষ’. `তা হলে তাঁদের মহা-কাবু করব’ – প্রত্যুত্তর পেলেন সুন্দরী শ্রেষ্ঠআ নৃত্য-কুশলী উর্ব্শি’র কাছ থেকে!

*   *   *   *   *

…কথা মতো ঋষি নারদ মহা ঋষি কুতুক’কে দেব রাজের আমন্ত্রন নিজে পৌঁছে দিতে ম র্ত্য লোকে এলেন. ঋষি বর খুব সম্মান’এর সাথে নারদ’কে স্বাগত জানালেন আর দুই জন অন্য ঋষি’র সঙ্গে দেবরাজের কাছে নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হতে প্রস্তুত হলেন!

সেই বিশেষ দিন টিতে ঋষি নারদ নিজে সঙ্গে করে মহা ঋষি কুতুক আর তাঁর দুই সহচর’কে নিয়ে দেব রাজের সভা’য় উপস্থিত হলেন স্‌ভায় তিল ধারণের জায়গা খালি নেই! সুন্দরী শ্রেষ্ঠ-আ ন্রত্য পারঙ্গমা উর্ব্শি ন্রত্য করতে আসছেন, সবাই উদ্গ্রীব – আজকে কোন বিশেষ নাচ তিনি দেখাবেন! দেবরাজ ইন্দ্র নিজে সঙ্গে করে তাঁর তিন অভ্যাগত’ মহা পুরুষ’কে মহা সমাদরে স্‌ভা’য় উপস্থিত হলেন; অবশ্যই মহা মুনি নারদও রয্ছেন সাথে; তাঁরা উপবেশনের পর ইন্দ্রের ইঙ্গিতে স্‌ভা’র মৃদু গুঞ্জন থেমে গেল; অন্য নাচ গীত বাদ্য আদি ও বন্ধ হোল আসল অনুষ্ঠআন এবারে শুরু হতে যাচ্ছে

মৃদু নিক্কণের সাথে অঙ্গের সুরভি ছড়িএ উর্ব্শি এসে স্‌ভা’য় প্রবেশ করলেন; দেবরাজ, সম্মানিত মহা ঋষি’দের ও ত্দপরে উপস্থিত অন্যদের প্রণতি জানিএ তাঁর বিশেষ ন্রত্য কলা শুরুর প্রস্তুতি তে বাদ্য’কার আদি’দের ইঙ্গিত করলেন ; অবশ্য অভিবাদ্ন জানাতে গিয়েতিনি ঋষি’দের দিকে তাকিয়ে বলে রেখে ছিলেন – “আজ আমি আপনাদের সম্মানে বিশেষ একটি ধরণএর নাচ দেখতে যাচ্ছি; এর নাম নির্মোক নৃত্য; যদি কখনও আমার নাচে আপনাদের অশালীন বা আপত্তি কর কিছু আছে বলে মনে হয়, আমায় মানা করবেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে নাচ বন্ধ করে দেব’; উত্তরে মহা ঋষি কুতুক প্রসন্ন মুখে `স্বস্তি’ জানালে উর্ব্শি নৃত্য শুরু করলেন

নাচের শুরু হবার কিছু সময় পরে বিশেষ ছন্দে আর লীলায় উর্ব্শি তাঁর মনি-মুক্তা খচিত প্রথম আবরণ ফেলে দিলেন; কুতুকের এক সঙ্গী ঋষি বলে উঠে ছেন – `না এ আর দেখা যায় না’; কিন্তু তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই কুতুক ঋষি’র গম্গমে গলায় প্রতিবাদ ভেসে এল – `না, এতে কিছু দোষ তো আমি দেখতে পাচ্ছি না, তুমি নাচ চালিয়ে যাও’; স্মিত মুখে উর্ব্শি আবার নাচে মন দিলেন; প্রথম ঋষি কে দেখা গেল তিনি মাথা নিচু করে চোখ বুজে বসে আছেন. উর্ব্শি দেবরাজের দিকে প্রচ্ছ্ন্ন ভাবে তাকিয়ে ইঙ্গিতে জানালেন – `এক পুরুষ কাবু হয় পড়েছেন!’

আরো কিছুক্ষণ লীলা-যিত ভঙ্গিমা’য় নাচ দেখা’নর পর উর্ব্শি তাঁর দ্বিতীয় আবরণ উন্মোচ্ন করে দিলেন; মহা ঋষি কুতুকের সঙ্গী ঋষি দু- চোখে হাত চাপা দিয়ে বলে উঠেছেন – `বন্ধ করো এ নাচ, এ তো অশালীন..’ তাঁর মুখের কথা শেষ হতে যত টুকু দেরী, কুতুক বলে দিলেন – `না, আমার আরও নির্মোক মোচন দেখা’র আছে, তুমি নাচ চালিয়ে যাও’; দেব রাজের’ দিকে অলক্ষ্যে বিজযীর হাসি হেসে নাচ আবার শুরু করলেন উর্ব্শি ; উনার সেই হাসি’র অর্থ – `আরও এক পুরুষ কাবু হয় ছেন, দেব রাজ’! ইন্দ্রে’র মুখেও মৃদু হাসি, কারণ – সেই ঋষি চোখে হাত চাপা দিলেও অন্য সবাই যখন নাচ দেখায় ব্যাস্ত, তিনি তাঁর হাতে’র আঙ্গুল গুলো একটু ফাঁক করে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে নাচ দেখতে লেগেছেন!
*   *   *   *   *

…নাচ আবার শুরু হলো; বাদ্য যন্ত্র এর সাথে সাথে সু-কৌশলী দেহ ভঙ্গিমা আর অনায়াস পটূত্ব যেন নৃত্য শিল্প’কে এক অন্য লোকে পৌঁছে দিয়েছে; সমস্ত স্‌ভা তন্ময় হএ সেই সুষমা’তে নিমগ্ন যেন হয় পড়েছে. মহা ঋষি কুতুক সেই এক ভাবে, মেরু দন্ড সিধে রেখে উর্ব্শি”র নাচ দেখে যাচ্ছেন. খানিক পরে মৃদঙ্গ-পাখোয়াজ আদি’র তে-হাই এর সাথে সাথে সমে এসে উর্ব্শি তাঁর শরীরের শেষ বসন টুকু খুলে ফেলে পাষাণ প্রতিমা দাঁড়ালেন গেল. স্‌ভা স্তব্ধ বিস্ময়ে সেই সুন্দরী শ্রেষ্ঠ-আ’র দেহ বল্লরি’র শোভা দেখে আর নাচের অতি দুর্লভ কুশলতা’কে অভিনন্দ্ন জানিয়ে `সাধু সাধু’ রবে  মুখর হয় উঠেছে;

সকল প্রশংসা ধ্বনি’র মধ্যে মহা ঋষি কুতুক’এর গুরু গম্ভীর গলা সোনা গেল – `খোল উর্ব্শি, বাকি নির্মোক ও উন্মউক্ত করো, আমি অপেক্ষা করে আছি’
স্তমভিত বিস্ময়ে উর্বশি তাঁর দিকে তাকালেন – `ভগবন, আমি তো আমার ন্রত্য শেষ করেছি, আর কোন আবরণ আমার ওপরে তো নেই’?
ঋষি কুতুক অ-সন্তুষট গলা’য় বলে উঠে ছেন – `কেন, তোমার ত্বক, তোমার শরীর’এর মাংস-পেশী আদি, আত্মা তো আরও অনেক নির্মোক এর নীচে আছেন’?
স্‌ভা হতবাক! ঋষি কী বলছেন? সে গুলো কী করে উনমুক্ত করা যাবে? নারদ ঋষি এগিয়ে এসেছেন, তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে বল্ছেন – `পাগল হলে না কী হে, কুতুক? উর্ব্শি তাঁর নাচের মাধ্যমে তাঁর সমস্ত আবরণ তো শিল্প-সুন্দর ভাবে খুলে দিয়ে ছেন; আর কী খুলবেন তিনি?
অসহিষ্ণু গলায় কুতুক উত্তর দিলেন – `আমি আরও ভেতরে, যেখানে আত্মা বিরাজ করেন, সেখান পর্য্ন্ত দেখতে চেয়ে ছিলাম; শুধু আবরণ-হীন দেহ নয়; যাই হক, সেটা যখন সম্ভব না, আমার আর দেখার বা থাকার কোন স্প্রিহা নেই; তোমায়, দেব রাজ আদি সবা’ই কে আমার নমস্কার জানি’এ আমি এবার নিজের লোকে ফিরে যাচ্ছি. আমি তুষ্ট হতে পারি নি’
ক্ষোভে, দুঃখে উর্ব্শি’র চোখে জল এসে গেল; দেবরাজ, নারদ এঁরা এগিয়ে এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করতে লাগলেন; কিন্তু উর্ব্শি তাঁর জীবনে এই প্রথম এ’রকম তিরস্কার শুনে ছেন. কোন মান্য অতিথি তাঁকে প্রশংসা না করে চলে গেছেন, এ রকম আগে কখনও হয় নি; এ ছাড়া তিনি যে বড় মুখ করে মহা পুরুষ কে মহা কাবু করবেন বলে ছিলেন! উল্টে তো মহা ঋষি কুতুক অ-সন্তুষ্ট হয় চলে গেলেন. তাঁর মনে বড় ধিককার জ্ন্মাল. তিনি দেবরাজের কাছে অনুমতি নিয়ে কিছু দিনের জন্য তপস্যা করতে মন্দর পর্বতে চ্লে গেলেন (সমাপ্ত)

*******