মহা ঋষি কুতুক ও `নির্মোক নৃত্য’ (The Great Sage Kutuk and a Dance)

আজ মহা ঋষি কুতুক’এর গল্প শোনাই; এটি ও পরশু রামের লেখা একটি রম্য রচনা; এই গল্প’টির নাম যত দূর মনে পড়ছে – ছিল `নির্মোক নৃত্য’. মা’কে জিগ্গেস করে জানতে পেরে ছিলাম –…

Source: মহা ঋষি কুতুক ও `নির্মোক নৃত্য’ (The Great Sage Kutuk and a Dance)

Advertisements

মহা ঋষি কুতুক ও `নির্মোক নৃত্য’ (The Great Sage Kutuk and a Divine Dance)

আজ মহা ঋষি কুতুক’এর গল্প শোনাই; এটি ও পরশু রামের লেখা একটি রম্য রচনা; এই গল্প’টির নাম যত দূর মনে পড়ছে – ছিল `নির্মোক নৃত্য’. মা’কে জিগ্গেস করে জানতে পেরে ছিলাম – ` নির্মোক ‘ মানে আবরণ বা আচ্ছাদন (covering).

গল্পের শুরু’তে আছে মর্ত্য লোকে থেকে সদ্য় ঘুরে আসা নারদ-মুনি’র কাছে নানা বিবরণ’এর মধ্যে দেব রাজ ইন্দ্র এক জন ঋষি’র খুব ক্ঠিন / উগ্র তপস্যা’র কথা জেনে দুশ্চিন্তআ’য় পড়ে গেছেন; তাঁর নাম মহা ঋষি কুতুক. সিংহাসনে চিন্তিত মুখে তিনি হেলে বসে সখা মাতলি’র সঙ্গে নিম্ন স্বরে শলা-পরাম্র্শ করতে লেগে পড়েছেন. এটা অব্শ্য নতুন কথা কিছু নয়; যখনি এ রকম কোন মুনি ঋষি’র উগ্র তপস্যা’র খোঁজ – খবর আসে, দেব রাজের এই এক চিন্তা ক্লিষট মুখ দেখা যায়; তাই মাতলি প্রথমে এটা’তেও কোন গুরুত্ব দেন নি. সখা’কে শান্ত / নিশ্চিন্ত থাকতে পরামর্শ দিয়ে ছিলেন. কিন্তু ভ্বি তো ভোলা’র নয়! নমীচি’র ঘটনা এক বার হয় যাবার পরে এ রকম কোন খবর পেলেই শংকিত হয় পড়েন; খুব দোষ দেয়া যায় না, সিংহাসন সামলানো বলে কথা!

*   *   *   *   *

এ দিকে দেখতে গেলে দেব রাজের শুধু একটা ঝামেলা না কী? অপ্সরা, স্বর্গ এর অন্যান্য সুন্দরী ‘দের নিয়েও  কী কম হ্যাপা সামাল তাঁকে দিতে হয়! একটু সুনাম হলে পরে’ই আর দেখতে হয় না, গুমোর’এর ঠেলা সামলে ওঠা দায় হয় পড়ে; কোন কাজ চাইলে তাদের দিয়ে পাওয়া যায় না.  ম র্ত্য লোকে তাদের মধ্যে বেশির ভাগ ই যাবার নামে ঠোঁট বাঁকায়, মেনকা-রম্ভা-উর্ব্শি এদের তো ধরা-ছোঁয়া’ই যায় না, তৃতীয় জন তো বলে’ই রেখেছে যে সে ম র্ত্য লোকে আর যেতে চায় না. অবশ্য সত্যি বলতে কী – সেখানে কাউকে পাঠা’তে ইন্দ্রের ও আর ততো ভরসা হয় না. মেনকা একবার, উর্ব্শি একবার দীর্ঘ কাল কাটিয়ে তবে গিয়ে ফিরে আসতে পেরে ছিল; তা’র চেয়ে যদি কোন ভাবে মহা ঋষি কুতুক’কে স্বর্গ লোকে কোন ভাবে ডাকিয়ে এনে খুশি করে ওই সব কঠইন কাজ থেকে মনযোগ হঠিয়ে দেবার কোন উপায় করা যেতে পারে, বেশ হয়!

এই রকম কথা-বার্তা যখন চলছে,  স্নানাহার সেরে শ্রী নারদ ঋষি আবার দেব রাজের সমুখে উপস্থিত হলেন – কী ঠিক করলেন, দেব রাজ?’ নারদের প্রশ্নে খানিক কিন্তু কিন্তু ভাবে ইন্দ্র উত্তর দিলেন – `ওই কথাই হচ্ছিল, মনে ভাব ছিলাম কী, কোন ভাবে যদি মহা ঋষি কুতুক’কে স্বর্গে নিয়ে আসা যেত; মড়ত্য লোকে উর্ব্শি যেতে বড় একটা চায় না, আর আমরা সবাই সামনে উপস্থিত থাকলে হয়ত সুবিধে বেশি হতে পরে’; দেব রাজের কথা শেষ হতে না হতে’ই নারদ বলে উঠে ছেন – `এ আর এমন কী বেশি কথা? আমি নিজে আপনার হয় ঋষি’কে স-বান্ধবে নিমন্ত্রণ করে আসব. উনি আমার কথা ফেলতে পারবেন না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন’

ঋষি নারদে’র থেকে এত বড় একটা সাহায্য পাবার প্রতিশ্রুতি এত সহজে পেয়ে দেব রাজের মুখ আনন্দে উজ্বল হয় উঠল – আমায় বাঁচালেন মুনি বর; কী ভাবে যে এগুব, তা ঠিক করে উঠতে পার ছিলাম না. তার পরে এটা ঠিক হল যে – দশ দিন পরে যে পূর্ণিমা রাত আসছে, সেই রাতে উর্ব্শি’র নাচ দিয়ে মহা ঋষি কুতুক (আর তাঁর সঙ্গে আসা অন্য অতিথি’দের ও) দেব রাজ সম্বর্ধনা জানাবেন!

ইন্দ্র নিজে গিয়ে উর্ব্শি কে প্রস্তুত হতে বললেন – `দেখ, যেন ঋষি’কে যথার্থ রূপে কাবু করতে পার’; আত্ম-প্রত্য’য়ের হাসি হেসে উর্ব্শি জানতে চাইলেন – `যে বা যাঁরা আসছেন, তাঁরা পুরুষ তো?’ ইন্দ্র উত্তর দিলেন – `শুধু পুরুষ নয়, মহা পুরুষ’. `তা হলে তাঁদের মহা-কাবু করব’ – প্রত্যুত্তর পেলেন সুন্দরী শ্রেষ্ঠআ নৃত্য-কুশলী উর্ব্শি’র কাছ থেকে!

*   *   *   *   *

…কথা মতো ঋষি নারদ মহা ঋষি কুতুক’কে দেব রাজের আমন্ত্রন নিজে পৌঁছে দিতে ম র্ত্য লোকে এলেন. ঋষি বর খুব সম্মান’এর সাথে নারদ’কে স্বাগত জানালেন আর দুই জন অন্য ঋষি’র সঙ্গে দেবরাজের কাছে নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হতে প্রস্তুত হলেন!

সেই বিশেষ দিন টিতে ঋষি নারদ নিজে সঙ্গে করে মহা ঋষি কুতুক আর তাঁর দুই সহচর’কে নিয়ে দেব রাজের সভা’য় উপস্থিত হলেন স্‌ভায় তিল ধারণের জায়গা খালি নেই! সুন্দরী শ্রেষ্ঠ-আ ন্রত্য পারঙ্গমা উর্ব্শি ন্রত্য করতে আসছেন, সবাই উদ্গ্রীব – আজকে কোন বিশেষ নাচ তিনি দেখাবেন! দেবরাজ ইন্দ্র নিজে সঙ্গে করে তাঁর তিন অভ্যাগত’ মহা পুরুষ’কে মহা সমাদরে স্‌ভা’য় উপস্থিত হলেন; অবশ্যই মহা মুনি নারদও রয্ছেন সাথে; তাঁরা উপবেশনের পর ইন্দ্রের ইঙ্গিতে স্‌ভা’র মৃদু গুঞ্জন থেমে গেল; অন্য নাচ গীত বাদ্য আদি ও বন্ধ হোল আসল অনুষ্ঠআন এবারে শুরু হতে যাচ্ছে

মৃদু নিক্কণের সাথে অঙ্গের সুরভি ছড়িএ উর্ব্শি এসে স্‌ভা’য় প্রবেশ করলেন; দেবরাজ, সম্মানিত মহা ঋষি’দের ও ত্দপরে উপস্থিত অন্যদের প্রণতি জানিএ তাঁর বিশেষ ন্রত্য কলা শুরুর প্রস্তুতি তে বাদ্য’কার আদি’দের ইঙ্গিত করলেন ; অবশ্য অভিবাদ্ন জানাতে গিয়েতিনি ঋষি’দের দিকে তাকিয়ে বলে রেখে ছিলেন – “আজ আমি আপনাদের সম্মানে বিশেষ একটি ধরণএর নাচ দেখতে যাচ্ছি; এর নাম নির্মোক নৃত্য; যদি কখনও আমার নাচে আপনাদের অশালীন বা আপত্তি কর কিছু আছে বলে মনে হয়, আমায় মানা করবেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে নাচ বন্ধ করে দেব’; উত্তরে মহা ঋষি কুতুক প্রসন্ন মুখে `স্বস্তি’ জানালে উর্ব্শি নৃত্য শুরু করলেন

নাচের শুরু হবার কিছু সময় পরে বিশেষ ছন্দে আর লীলায় উর্ব্শি তাঁর মনি-মুক্তা খচিত প্রথম আবরণ ফেলে দিলেন; কুতুকের এক সঙ্গী ঋষি বলে উঠে ছেন – `না এ আর দেখা যায় না’; কিন্তু তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই কুতুক ঋষি’র গম্গমে গলায় প্রতিবাদ ভেসে এল – `না, এতে কিছু দোষ তো আমি দেখতে পাচ্ছি না, তুমি নাচ চালিয়ে যাও’; স্মিত মুখে উর্ব্শি আবার নাচে মন দিলেন; প্রথম ঋষি কে দেখা গেল তিনি মাথা নিচু করে চোখ বুজে বসে আছেন. উর্ব্শি দেবরাজের দিকে প্রচ্ছ্ন্ন ভাবে তাকিয়ে ইঙ্গিতে জানালেন – `এক পুরুষ কাবু হয় পড়েছেন!’

আরো কিছুক্ষণ লীলা-যিত ভঙ্গিমা’য় নাচ দেখা’নর পর উর্ব্শি তাঁর দ্বিতীয় আবরণ উন্মোচ্ন করে দিলেন; মহা ঋষি কুতুকের সঙ্গী ঋষি দু- চোখে হাত চাপা দিয়ে বলে উঠেছেন – `বন্ধ করো এ নাচ, এ তো অশালীন..’ তাঁর মুখের কথা শেষ হতে যত টুকু দেরী, কুতুক বলে দিলেন – `না, আমার আরও নির্মোক মোচন দেখা’র আছে, তুমি নাচ চালিয়ে যাও’; দেব রাজের’ দিকে অলক্ষ্যে বিজযীর হাসি হেসে নাচ আবার শুরু করলেন উর্ব্শি ; উনার সেই হাসি’র অর্থ – `আরও এক পুরুষ কাবু হয় ছেন, দেব রাজ’! ইন্দ্রে’র মুখেও মৃদু হাসি, কারণ – সেই ঋষি চোখে হাত চাপা দিলেও অন্য সবাই যখন নাচ দেখায় ব্যাস্ত, তিনি তাঁর হাতে’র আঙ্গুল গুলো একটু ফাঁক করে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে নাচ দেখতে লেগেছেন!
*   *   *   *   *

…নাচ আবার শুরু হলো; বাদ্য যন্ত্র এর সাথে সাথে সু-কৌশলী দেহ ভঙ্গিমা আর অনায়াস পটূত্ব যেন নৃত্য শিল্প’কে এক অন্য লোকে পৌঁছে দিয়েছে; সমস্ত স্‌ভা তন্ময় হএ সেই সুষমা’তে নিমগ্ন যেন হয় পড়েছে. মহা ঋষি কুতুক সেই এক ভাবে, মেরু দন্ড সিধে রেখে উর্ব্শি”র নাচ দেখে যাচ্ছেন. খানিক পরে মৃদঙ্গ-পাখোয়াজ আদি’র তে-হাই এর সাথে সাথে সমে এসে উর্ব্শি তাঁর শরীরের শেষ বসন টুকু খুলে ফেলে পাষাণ প্রতিমা দাঁড়ালেন গেল. স্‌ভা স্তব্ধ বিস্ময়ে সেই সুন্দরী শ্রেষ্ঠ-আ’র দেহ বল্লরি’র শোভা দেখে আর নাচের অতি দুর্লভ কুশলতা’কে অভিনন্দ্ন জানিয়ে `সাধু সাধু’ রবে  মুখর হয় উঠেছে;

সকল প্রশংসা ধ্বনি’র মধ্যে মহা ঋষি কুতুক’এর গুরু গম্ভীর গলা সোনা গেল – `খোল উর্ব্শি, বাকি নির্মোক ও উন্মউক্ত করো, আমি অপেক্ষা করে আছি’
স্তমভিত বিস্ময়ে উর্বশি তাঁর দিকে তাকালেন – `ভগবন, আমি তো আমার ন্রত্য শেষ করেছি, আর কোন আবরণ আমার ওপরে তো নেই’?
ঋষি কুতুক অ-সন্তুষট গলা’য় বলে উঠে ছেন – `কেন, তোমার ত্বক, তোমার শরীর’এর মাংস-পেশী আদি, আত্মা তো আরও অনেক নির্মোক এর নীচে আছেন’?
স্‌ভা হতবাক! ঋষি কী বলছেন? সে গুলো কী করে উনমুক্ত করা যাবে? নারদ ঋষি এগিয়ে এসেছেন, তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে বল্ছেন – `পাগল হলে না কী হে, কুতুক? উর্ব্শি তাঁর নাচের মাধ্যমে তাঁর সমস্ত আবরণ তো শিল্প-সুন্দর ভাবে খুলে দিয়ে ছেন; আর কী খুলবেন তিনি?
অসহিষ্ণু গলায় কুতুক উত্তর দিলেন – `আমি আরও ভেতরে, যেখানে আত্মা বিরাজ করেন, সেখান পর্য্ন্ত দেখতে চেয়ে ছিলাম; শুধু আবরণ-হীন দেহ নয়; যাই হক, সেটা যখন সম্ভব না, আমার আর দেখার বা থাকার কোন স্প্রিহা নেই; তোমায়, দেব রাজ আদি সবা’ই কে আমার নমস্কার জানি’এ আমি এবার নিজের লোকে ফিরে যাচ্ছি. আমি তুষ্ট হতে পারি নি’
ক্ষোভে, দুঃখে উর্ব্শি’র চোখে জল এসে গেল; দেবরাজ, নারদ এঁরা এগিয়ে এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করতে লাগলেন; কিন্তু উর্ব্শি তাঁর জীবনে এই প্রথম এ’রকম তিরস্কার শুনে ছেন. কোন মান্য অতিথি তাঁকে প্রশংসা না করে চলে গেছেন, এ রকম আগে কখনও হয় নি; এ ছাড়া তিনি যে বড় মুখ করে মহা পুরুষ কে মহা কাবু করবেন বলে ছিলেন! উল্টে তো মহা ঋষি কুতুক অ-সন্তুষ্ট হয় চলে গেলেন. তাঁর মনে বড় ধিককার জ্ন্মাল. তিনি দেবরাজের কাছে অনুমতি নিয়ে কিছু দিনের জন্য তপস্যা করতে মন্দর পর্বতে চ্লে গেলেন (সমাপ্ত)

*******

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর

 

বিদ্যাসাগ আর দয়ার সাগর – I

এই গল্প’টিতে নায়ক হচ্ছে ক্ষুদে দুই জন – কাবুল আর টাবুল; জ্যাঠ তুতো – খুড় তুতো ভাই তারা, একই বাড়ি’তে থাকে…কাবুলের মা টাবুলের জেঠইমা; কাবুল টাবুল এর থেকে দুই বছরের মতো বড়…ভারি গলায় গলায় ভাব দুজনাতে…স্কুল থেকে ফিরে আসতে যতটুকু দেরী, তার পরে বলা যায় দুজনে অবিচ্ছেদ্য…একসাথে মাঠে খেলতে যায়, সেখানে না যেতে পারলে নিজেদের তিন তলা বাড়ি’র বড় ছআদে তারা ঘনটা ভর আপন মনে খেলায় মেতে থাকে…ছাতের কোনায় একটেরে চিলে কোঠা’র ঘর খানা তাদের ভারি পছন্দের জায়গা…অত রকম বাতিল বা বাড়ির বাড়তি জিনিষ পত্র’এর পাহাড় এ ওরা তাদের কল্পনা’র লাগাম ছুটিয়ে নানা খেলা বার করে, এক পাশে পুরানো লেপ-তোষক-জআজিম-ঢিপি করে রাখা…কখনো সেটা রূপ কথা’র পাহাড়, যা পেরিয়ে ও পাশে পৌঁছাতে পারলেই `রাজ পুত্র’ শর্তে জিতে যাবে, ডাইনী আর ধরতে পারবে না, কখনো বা সেটা ঢালু বেয়ে নীচে নামার প্রতিযোগীতা’র চেহারা নেয়, দাদা যা বলে, প্রায় বিনা তর্কে টাবুল মেনে নেয়…ভাবের বহর দেখে মাঝে মাঝে দু জনা’র মা হাসেন…আবার কখনও বেশি চুপ-চাপ থাকলে একজন কেউ উঠে আসেন খোঁজ নিতে, কী করছে দুটো ভাই মিলে…এভাবে দিন কাটে…

 

বিদ্যাসাগ আর দয়ার সাগর -II

সকালে মাস্টার মশাই দু ভাই ‘কে এক সাথে পড়আ-তে আসেন; টাবুল ছোট, ক্লাস ফোরের পড়া শেষ হতে কত ই বা সময় লাগে! দাদা’র জ্ন্য সে অপেক্ষা’য় থাকে, কাবুল এর পড়া শেষ হতে বেশি সময় যায়, তাই সকালে ওদের হাতে খেলবার বা নিজেদের মধ্যে কথা বল বার সুযোগ বড় একটা হয় না…স্যার চলে যাবার পরে স্কুলে যাবার তাড়া, স্নান করা, খাওয়া, ব্যাগ গুছিয়ে প্রায় দৌড় দেবার অবস্থ্যা…একটা দুটো কথা নিজেদের মধ্যে বলে কখন! সব সময় মা বা জ্যাঠাইমা সামনে, খালি তাড়া দিতে থাকেন…তাই ওরা বিকেলে ছাতে খেলার সময়’এর দিকে প্রায় চেয়ে থাকে…সামনে তো বড়’রা থাকেন না তাই মনের সুখে তারা নিজেরা নিজেদের মতো কথা-বার্তা চালাতে পারে… বাবা জেঠউ এরা অপিস থেকে এসে পড়েন…তাই তাঁদের জল খাবার এর ব্যাবস্থা করা, কথা বলা এসবে মা-এঁরা খুব ব্যাস্ত থাকেন… তার ওপরে যদি পাড়া পড়শী কেউ দেখা করতে এসে পড়েন, তা হলে তো কথাই নেই… শনি বা রবি বার হলে সিনেমা চলে টিভি’তে, বাচ্চাদের ফিল্ম না হলে কাবুল-তাবুল’দের ডাক পড়ে না, তাই সে সময় টা ওদের বেশ সুখের সময় … অনেক ক্ষণ ধরে এক টানা খেলা করতে ওরা পারে

 

বিদ্যাসাগ আর দয়ার সাগর –III

…স্কুলে যাবার সময় কাবুল তাবুল বাড়ি’র গনেশদা’র সঙ্গে যায়; সেই ওদের দিয়ে আসে আর নিয়েও আসে…বাড়ি’র বাজার দোকান করা, বড়’দের ফুট – ফরমাশ খাটা এসব কাজের মধ্যে সময় সময় সে ওদের দুই ভাই’এর খেলার সঙ্গী’ও হয়, তবে সে সুযোগ কমই পাওয়া যায়…পাড়া’র মধ্যে বাজার এর কাছে বিদ্যাসাগর ইন্স্টিট্যূশন ‘এতে দুই ভাই পড়ে…স্কুল টা ভালো, বাংলা মিডিয়ম হলেও মোটামুটি সুনাম আছে এ ছাড়া বাড়ি’র কাছে বলেও বাবা-জ্যাঠা এখানেই দু জনা’কে ভ্র্তি করে দিয়ে ছেন…তারা খুব খারাপ করছেও না…তবে উঁচু ক্লাসে উঠতে বাকি তো আছে, তাই এ নিয়ে কেউই অত কিছু চিন্তা করেন না

আজ স্কুল থেকে দু জনে ফিরে রোজ কার মতো বই খাতা রেখে, হাত মুখ ধোয়া, জল খাবার খাওয়া এসব পর্ব চুকিয়ে ছতে উঠে এসেছে; ক্লাসে তাবুলের এক বন্ধু’র জন্ম দিন ছিল, সে দুটো চকোলেট পেয়েছিল…তখনি সে খায় নি, পকেটে করে নিয়ে এসেছে দাদা’কে দিয়ে খাবে বলে..ছোট ভাই’এর হাত থেকে খুশি  হয় মুখে সেটা পুরল কাবুল…এবারে নিজের টা গালে দিয়ে তাবুল তাদের বল ব্যাট এ সব রাখার জায়গা’ সেই চিলে কোঠা’য় ঢুকল…পেছন পেছন কাবুল ও এল…কোঠা’ খানা বেশ বড় কিন্তু বলতে গেলে মেঝে থেকে প্রায় ছআত পর্যন্ত নানা জিনিষ’এ বোঝাই…থেকে থেকে ওরা নিজে দের মধ্যে (অবশ্য ই বড় দের কানের নাগালের বাইরে) বলা বলিকরে – `বড় রাও কত বাজে জিনিষ পত্র জমা করে রাখে, দেখেছিস! খালি আমাদের কে বলে বাজে জিনিস জমিও না, ফেলে দাও’!

 

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর –IV 

…ট্‌ফি খাওয়া শেষ করে দুই ভাই তাদের প্রিয় বল খেলা শুরু করে; চাটের দুই দিকে গনেশদা তাদের খেলা’র জন্য চক দিয়ে গোল পোস্ট এঁকে রেখেছে, এখানে তারা খেলতে খুব পচ্ছন্দ করে; স্কুলের মাঠে খেলবার উপায় আছে! এত জনে বল নিয়ে টানা টানি করে, মারা মারি ও লেগে যায় তাই ওরা বাড়ির চটেই শান্তি’তে খেলে নেয়…কিন্তু আজ  তাবুল লক্ষ্য় করছে – কাবুল কেন যেন মন দিয়ে বড় একটা খেলছে না, কিছু যেন একটা ভাবছে …`না, আর খেলতে ভাল লাগ্ছে না’ বলে সে খেলা থামিয়ে দেয়… খানিক চুপ করে দেখার পর তাবুল আর থাকতে না পেরে প্রশ্ন করে – `কী ভাবছিস রে, দাদা?’ দু জনে এসে চিলে কোঠা’র মধ্যে পড়ে থাকা একটা পুরনো আর বাতিল ত্ক্তপোশে বসে…সেটার একটাপা-ভাঙ্গা, অন্য আরেক টা পায়া নড়বড়ে, তাই খুব সাবধানে ওরা জায়গা বুঝে বসে…তাবুল আবার তাড়া দেয় – `বল না, কী হএছে’? কাবুল এবারে আস্তে আস্তে উত্তর দেয় – `সামনের সপ্তআহে বলাই স্যার’এর ক্লাস টেস্ট আছে রে, তাই…’ এবার দাদা’র চিন্তা’র কারণ বুঝতে পারে তাবুল…বলাই স্যার ওদের স্কুলের গেম্‌স টিচার, খুব শ্ক্ত-পোক্ত চেহারা আর বাংলও উনি বাংলা ও নীচের দিকের ক্লাস গুলো’তে পড়ইয়ে থাকেন, খুব রাশভারি চেহারা আর সবাই বলা-বলি করে, পচ্ছন্দ মতো না হলে ছাত্র’দের কখনো কখনো এক দুই ঘা বেত মারতে খুব তিনি পেছ-পা হন না…ওই বেত দুই ভাই-ই খেলার মাঠে কারুর কারুর  পিঠে পড়তে দেখেছে… তাই দাদা’র চিন্তা’র কারণ জানতে পেরে তাবুল নিজে ও খুব উদ্বিগ্ন হয় পড়ে…

`কী করবি রে তুই?’ কাবুল বলে – `তাই ভাবছি, যদি কোন ভাবে জানতে পারতাম, উনার প্রশ্ন পত্র ‘তে কিসের ওপর আসবে, কী যে ভাল হোত, সেটাই খুব ভাল করে ঝালিয়ে নিয়ে যেতাম, এক মাসে তো অনেক কিছু পড়আ দাদা’র সঙ্গে তাবুল সব বিষয়ে এক মত, এ বারে’ও তার কোন আলাদা হল না…

 

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – V

…দাদা’র মুখের দিকে তাকিয়ে খানিক ভাবল তাবুল…আচ্ছা! আমাদের মাস্টার মশাই’কে একটু জিগ্গেস করতে পারিস্ না? কাবুল যে তা করে নি, তা নয়; আজই সকালে পড়ানো’র শেষে সে একটু কিন্তু কিন্তু করে তাঁকে বলাই স্যার’এর বাংলা পরীক্ষা’র কথা তুলে ছিল; জানতেও চেয়ে ছিল কোন `সাজেশনস’ উনি যদি দেন…ভবেশ বাবু স্থির চোখে ওর দিকে একটু তাকিয়ে গমভির গলায় উত্তর দিয়েছিলেন – `যা তোমায় পড়আনো হএছে, ভাল ভাবে তা অভ্যাস করো, সাজেশনস এর কোন দরকার নেই’…এর পর আর কিছু বলতে কাবুল এর সাহসে কুলায় নি…ছোট ভাই কে সে কথা খুলে বলতে লজ্জাই পেল কাবুল; তাই সে জবাব দিল – `ওতে কিছু হবে না রে, বড়’রা আমাদের কথা ঠিক বুঝতে চায় না’ 

   আবার খানিক ক্ষণ চুপ চাপ; কারুর থেকে যদি একটু সাহায্য পাওয়া যেত! হঠাত্ তাবুল’এর মুখ আশা’য় উজ্বল হয় উঠল…সব বড়’রা এ রকম নিশ্চয় ই নন, এই তো তাদের বলা হয় বিদ্যাসাগর মশাই নিজে ছোট’দের খুব ভাল বাসতেন…উনার মন’কে ফুলের মত কোমল বলা হয়, উনি নাকি কারু’র কষ্ট দেখলে বা সে অসুবিধেয় পড়েছে দেখলে যে কোন ভাবে সাহায্য করা’র চেষ্টা করতেন! তা হলে দাদা’র এই বিপদে কী উনার কাছে সাহায্য পাওয়া যাবে না? সে কাবুল কে বেশ জোর দিয়ে বলে উঠল `’ওঁরা তো বলেন – খুব মনযোগ দিয়ে এক মনে ডাকতে থাকলে ঠিক সাড়া দেন ঠাকুর…আমরা তো উনার স্কুলের’ই ছাত্র, তুই বিদ্যা সাগর মশাই’কে ডাক, নিশ্চয় ই তিনি তোকে বলে দেবেন’…কোথাও কোন আশা’র কিচ্ছু নাদেখতে পেয়ে কাবুল এত ক্ষণ মুখখানা ছোট করে বসেছিল…ভাই এর কথা’য় ওর মনেও একটা আশার আলো জ্বলে উঠল…সত্যই তো, এটা তো তার মাথা’য় আসে নি…ওদের স্কুলে তো সব সময় বিদ্যাসাগর মশাই’ কে দয়ার সাগর বলা হয় থাকে, উনি হয়তো রাগ – টাগ না করে ওকে বলে দেবেন কী প্রশ্ন বলাই স্যার করতে যাবেন, তা হলে আর কোন চিন্তার’ই কিছু থাকবে না!

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – VI

…খুশি মনে দু ভাই মিলে এবারে কোথায় আর কখন বিদ্যাসাগর মশাই কে ডাকা যায়, তার আলোচনায় মেতে  উঠেছে…`কোথায় বসি, বল তো? বেশ একটু সময় লাগবে, ডাকতে শুরু করলেই তো আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি এসে যাবেন না, বড়দের তো অনেক হাতে কাজ থাকে’…কাবুল এর এই প্রশ্নে তাবুল একটুও সময় নষ্ট না করে বলল – `কেন, আমাদের এই চিলে কোঠা’র ঘর টাতে?’ এটা কাবুল এর খুব মনে ধরল; অন্য কোথাও ওরা দু জনে খানিক ক্ষণ বসে কিছু করলেই বড়’রা দেখে ফেলবেন আর বড়’দের যা স্বভাব! শুধু তো প্রশ্নের ‘পর প্রশ্ন’ই করবেন, তা না, অকারণএ হয় তো বকুনি শুনতে হবে…চিলে কোঠা’ই তাই ভাল…সবাই জানে – ওরা দু জনে ওখানে খেলা ধুলো করে, খানিক বেশি সময় লেগে গেলেও কেউ অত খোঁজ করবে না`

ডাকতে গেলে কী কী জিনিষ লাগবে রে, দাদা?’ তাবুল এর কথা’য় কাবুল সোজা হয় বস্ল…একটা ছবি, সে তো আমাদের পড়া’র ঘরে’র দেয়ালে’ই আছে, গনেশ দা’কে বল্লেই খুলে এনে দেবে এখানে…একটা ধুপ্ কাঠি, একটা টুল, যার ওপরে ছবিটা রাখা হবে, ব্যাস, আর কী! দু ভাই খুব খুশি মনে নীচে নেমে গেল; রাতের খাওয়া-দাওয়া চুকে গেলে যে যার মা’এর কাছে শুতে গেছে…তাবুল মা’এর হাতে’র একটু মাথা বুলানো না পেলে ঠিক ঘুমোতে পারে না…মা তার কাছে বসে তাই ওর চুলে কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, প্রায় ঘুম এসে গেছে, আধ জাগা আধ বোঁজ আ গলা’তে সে মা’কে প্রশ্ন করে বসেছে – মা,

বিদ্যাসাগর মশাই খুব ভাল ছিলেন, না?’ মা তো অবাক! `কেন রে?’ `না, দাদা’র না বলাই স্যার’এর ক্লাস পরীক্ষা নিয়ে খুব চিন্তা’ তার পরের কথা গুলো প্রায় আর শোনা গেল না `উনা’কে জিগ্গেস করব আমরা কাল…তাবুল ঘুমিয়ে পড়েছে!

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – VII

ছেলে তো ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু তাবুলের মায়ের মনে চিন্তা শুরু হয় গেছে – `কী ব্যাপার, বাচ্চা দুটো কী করতে যাচ্ছে?’ যে কোন বিষয় হক না কেন,  কাবুলের মা’কে উনি না জানিয়ে পারেন না…রান্না ঘরে গিয়ে তিনি গিয়ে তাঁকে বল্লেন – `দিদি, দুটো বাচ্চা মিলে জানি কী কান্ড করতে যাচ্ছে!’ তাবুলের জ্যাঠাই-মা ভুরু একটু তুলে স-প্রশ্ন চোখে তাকালেন – `কেন, কী হল তোর’? সব শুনে তিনি তো হেসে’ই উড়ইয়ে দিলেন – `যা, বাচ্চা’রা একটু নিজেদের মতো করে খেলবে, বিদ্যাসাগর মশাই কে ডাকবে, তা নিয়ে ও তুই চিন্তা করবি’? খেলুক না ওরা’…না দিদি, তাবুলের মা ছাড়া’র পাত্রী নন; `ভেবে দ্যাখো, ওই চিলে কোঠা’য় একলা…’ কথা শেষ হবার আগেই বড়-জআ হাত তুলে হাসি মুখে তাকালেন – `কিচ্ছু ভাবিস্ না’…দিদি’র মুখে আত্ম-প্রত্যয়’এর হাসি দেখে এবার যেন একটু শান্তি পেলেন তাবুলের মা

পরের দিন সকাল থেকে’ই কাবুল আর তাবুল ত্ক্কে ত্ক্কে রয়ছে, গনেশ’কে কখন একটু বড়’দের ফাই-ফরমায়শ খাটা’র ফাঁকে আলাদা করে ধরতে পারবে! বাড়ি’তে বাবা-কাকা এঁরা থাকলে বা এই সব হ্পতা’র শেষ দিকে শনি-রবি বার গুলো’তে যেন গনেশ-দা চরকি’র মতো পাক দিয়ে ফেরে, তাকে কাছে পেতে আর নিজেদের দরকারী জিনিষ গুলো তাকে দিয়ে গুছিয়ে নিতে নিতে প্রায় দুপুর পার হয় গেল… ওদের খাওয়া হল, মা-এঁরা খাওয়া দাওয়া’র পাট চুকিয়ে একটু গড়ইয়ে নিতে গেলেন…তার পরে দুই ভাই তাদের সেই দরকারের জিনিষ গুলো নিয়ে আর প্রায় গনেশ-দা’র হাত ধরে টানতে টানতে চিলে কোঠা’র ঘরের দিকে নিয়ে গেল

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – VIII

সব গুছিয়ে দেবা’র পর ধুপ্ কাঠি জ্বেলে দিতে তবে গিয়ে গনেশ ছুটি পেল; সে অবশ্য বড়-মা’কে নানান কাজের ফাঁকে চট করে জিগ্গেস করে নিয়ে ছিল, তিনি খুব সহজ ভাবে `হ্যাঁ’ বলে দিয়ে ছিলেন; তাই গনেশে’র পরে বকুনি খাবার কোন ভয় ছিল না; কেবল তিনি ওকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে ছিলেন – আগুন বা দেশলাই যেন সে কোন মতে ছোটো দের হাতে না দেয়, তাই সে নিজে ধুপ্ কাঠ-ই জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছে…তার সঙ্গে বাচ্চা দের যেন মশা না কামড়ে দেয়, সে জ্ন্য একটা কচ্ছ্প – ছাপ ধুপ্ এর `কয়ল’ও জ্বেলে দিয়ে এসেছে…

গনেশ চলে যেতে কাবুল উঠে দরজআ তা ভেজিয়ে দিল; ছআতের ঘর টা এমনিতেই একটু একটেরে, এখন যেন একেবারে বেশি চুপ চাপ হয় পড়ল…অন্যান্য দিন এরা খেলা ধুলো নিয়ে থাকে, এসব নিয়ে চিন্তা করবার সময় পায় না. এখন এটা যেন ওদের কেও অস্বস্তি দিচ্ছিল; মনে জোর টেনে এনে কাবুল তাবুল কে নিয়ে এবার ছ্বি’র সামনে হাত জোড় করে চোখ বুঁজএ ব্সল…তাবুল একটু পরেই তার দাদা’কে জিগ্গেস করল, দাদা, উনি রাগী ছিলেন না তো? এ চিন্তা যে কাবুল এরও মাথায় আসেনি তা নয়; ওর ও মনে হয়ছে – যদি বিদ্যাসাগর মশাই এসে বকা-বকি করেন? ভাই ‘এর সামনে তাও সে সাহস দেখিয়ে অন্য কথা বলে – `না রে, উনাকে তো দযার সাগর বলা ও হোত, মনে হয় না আমাদের ওপরে রাগ করবেন’…একটু যেন মনে বেশি জোর পেল তাবুল; দাদার দিকে আরও একটু বেশি করে পাশ ঘেঁষে সে বসে হাত জোড় করল

একটু পরেই ঘরে `ক্চ’ করে একটা শব্দ শোনা গেল; `এসে গেছেন রে দাদা’ বলে উঠেছে তাবুল. একটু অ-প্রস্তুত গলাতে কাবুল উত্তর দিল – `না রে, আমি একটা পেয়ারা কামড়ে ছি’; একটু বিরক্ত হোল তাবুল – এই কী পেয়ারা খাবার সময়? এত বড় কারুর সঙ্গে এ ভাবে কী কথা বলে? ল্জ্জিত হয় কাবুল সেটা সরিয়ে রেখে আবার চিন্তা’য় মন দিল

 

বিদ্যাসাগর আর দয়ার সাগর – IX

আরও  খানিক পরে দরজাতে একটা যেন শব্দ হল; দু ভাই একসাথে চোখ খুলেছে; একজন কেউ যেন বড় চাদর গায়ে জড়ইয়ে সামনে দাঁড়িয়ে; উত্তেজনা’য় প্রায় এক সাথে দু জনে উঠে দাঁড়িয়েছে…`আপনি কে?’ কাবুলের গলা একটু কেঁপে গেছে; ভারি গলায় উত্তর এল `তোমরা তো আমায় ডাকছিলে, তাই না?’ আপনি-ই বিদ্যাসাগর মশাই?’ একটু কাশি’র সঙ্গে উত্তর এল `হ্যাঁ’…চাদরে ঢাকা মূর্তি’টি এবারে একটু নড়ে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল – `বল, কেন আমায় ডেকেছ তোমরা?’

হয় তো বা একটু ঘাবড়ে গিয়েছে বলে বা উত্তেজনায় প্রথমে কাবুল’এর মুখে কোন কথা সরছিল না; টাবুল ই একটু মরীযা হয় বলে ফেল্ল – `দাদা’র পরীক্ষা’ নিয়ে খুব ভয়, বলাই স্যার তো…’ কথা শেষ হবার আগেই মৃদু যেন একটা চাপা হাসি’র আওয়াজ পাওয়া গেল; দুই ভাই-ই এতে ভারি অবাক হয় – `বলাই স্যার’এর কথাও ইনি জানেন!’ তার পরে ভাবে – `এত বড় উনি, সব খবর তো উনি রাখবেন’ই’…এত ক্ষণে কাবুল এর মুখে কথা ফুটেছে – `যদি পরীক্ষা’তে ওই স্যার কী প্রশ্ন করবেন, তা জানতে পার তাম ; চাদরের নীচে থেকে প্রশ্ন এল – `উনাকে এত ভয় পাও কেন? তুমি কী পড়া ওঁর ঠিক মতো কর না? ক্লাসে দুষ্টু’মি কর?’`না, না, ‘ তড়-বড় করে কাবুল বলে উঠেছে – `উনি যে বড় রাগী, বেত নিয়ে সব সময় ঘোরেন, তাই ভয হয়, পড়আ জানা থাকলেও কী রকম যেন গুলিএয় যায়’!

এবারে উত্তর এল – `তুমি যদি উনার আগের শেখান লেসন্স গুলো ভালো করে লিখে ঝালিয়ে নাও, আর তার পরে পরীক্ষা দিতে যাও, দেখবে তুমি খুব ভাল করবে’; অ-কারণ ভয় কে মনে প্রশ্রয় দিও না; তবে শুধু চোখ বুলিএ গেলে কিন্তু হবে না. এছাড়া একটু ঘুরিয়েও একই প্রশ্ন দিতে পারে, লিখে তৈরি হলে সে ভয়’ও তোমার কেটে যাবে; তুমি খুব ভাল করবে তা হলে পরীক্ষা’তে!

একটু চুপ চাপ কাট্‌ল; এবারে দুই ভাই শুনতে পেল – `তা হলে আমি এবারে আসি? তোমরা একটু চোখ বোজ’… দুই ভাই কথা মতো চোখ বুজেছে; হাত তখনও জোড় করে রেখেছে… হঠাত খুব জোর একটা কাঠ বা খাটের সঙ্গে ধাক্কা খাবার শব্দ, আর তার সঙ্গে ব্যাথা পেলে যেমন লোকে কাতরে ওঠে, সেই রকম কথা খুব পরিচিত্ গলা’য় ভেসে এল – `বাবা রে বাবা! এই এক পা-ভাঙ্গা খাট হএছে, তলা’য় ঢোকাও গেল না, হাঁটু দুটো বুঝি গেছে’!

চমক ভেঙ্গে দুই ভাই লাফিয়ে ওঠে; `বিদ্যাসাগর মশাই তো মিলিয়ে যাবেন! খাটের তলা’য় ঢুকতে যাবেন কেন’? চোখ খুলে দেখে কী – চাদর সামনে মাটিতে পড়ে, আর টাবুলের জ্যাঠাইমা দু হাতে তাঁর হাটু চেপে ধরে বসে; আবার শুনতে পেল – `নে হাঁ করে দেখছিস কী তোরা? ধরে তোল আমায়’; দু জনে লজ্জআতে লাল হএ তাঁকে তুলে ধরে দিয়ে’ই তীর বেগে সিঁড়ি’র দিকে দৌড় মেরেছে; সিঁড়ি’র মুখে গনেশ দা দাঁড়িয়ে; প্রায় তাকে ঠেলে দুই ভাই সিধে নীচে `এ তো তাদের বিদ্যাসাগর নয়’ই, আর ইনি নিশ্চয দযার সাগর ও হবেন না, অন্ততঃ হাঁটু’তে চোট খাবার পর! তাই দুরে থাকাই ভাল!

 

(স্মৃতির অনু-লিখন সমাপ্ত)

 

 

অটল – পটল উপাখ্যান (The Story of Atol & Potol)

অটল চাঁদ আর পটল চাঁদের গল্প

 

অটল – পটল উপাখ্যান – I

এঁদের মধ্যে`বাবা’ হচ্ছেন অটল চাঁদ; সাধারণ সরকারী আপিসে বড় কেরানী ‘র চাকরী করেন; নিজে স্কুলে পড়েছেন ক্লাস ফোর পর্যন্ত; ছেলে পটল সবে ক্লাস সিক্স এতে উঠেছে, তাই তিনি মনে মনে একটু চিন্তিত থাকেন, কখন জানি সে পড়তে চ্লে আসে তাঁর কাছে…মাস্টার রেখে ছিলেন, কিন্তু তিনি জবাব দিয়ে চলে গেছেন সম্প্রতি, কেন সে টা বলার মতো.

এই তো পর্শু দিনের কথা; মাস্টার এসে উনা’র সামনে একটা খাতা মেলে ধরে দেখালেন…প্রথমে বাঁশ নিয়ে রচনা; পটল লিখেছে :-

`বাঁশ খুব কাজে লাগে; বাড়ি ঘর বানাতে; তাকে বংশ ও ব লা হএ থাকে  আবার যদি বংশ-ধর’এরা বেয়াদ্প হতে যাচ্ছে, তখন তাদের শায়েস্তা করতে এই বাঁশ খুব কাজে আসে’

এই দেখে অটল গম্ভীর হলেন – `আর দেখতে হবে না, বোঝা যাচ্ছে ওর `বংশ-তত্ব’ বেশ আয়ত্বে এসে গেছে…

মাস্টার ও গম্ভীর হলেন – `আর এবারে এটা; আমি ওকে স্কুলের হেড মাস্টার মশাই’এর কাছে দুই দিনের ছুটির আবেদন লিখতে বলে ছিলাম, শুনুন কী লিখেছে সে: –

: My Dear Headmaster Jaglal Babu,

   Pl. grant me two days leave. If you not, then let me remind you that your school approach road is getting repaired. Many stone chips will be available there for my use.

 

 

Yours sincerely,

Potolchand Sorkhel

 

N.B: Private tutor obviously took offence in such language and left his job that day only

 

খাতা সামনে ফেলে মাস্টার উঠে দাঁড়া লেন – `আমার দ্বারা হবে না, আপনি অন্য ব্যাবস্থা দেখুন’ অটল অনুনয় করে বার্ষিক পরীক্ষা টা কাটিয়ে যেতে বলে ছিলেন, মাস্টার তাতে কোন কান দেন নি তাই সেদিন থেকে অটল ভযে ভযে আছেন…

ছেলে খুব প্রশ্ন করে; যেমন সেদিন এসে বলে কী – `বাবা, তোমার নাম অটল কেন হল বল তো?’ উনি তো কিছু ভেবে পান না…শেষ এ ছেলে বিজযীর হাসি দিয়ে বলে কী – `আমি জানি, `নো-ট্ল’ থেকে `অটল’ তুমি যে লম্বা নও আর হবেও না তা নামেই প্রমাণ’ …চিন্তা করে দেখলেন বিচ্ছু টা খুব ভুল বলে নি, তিনি সত্যই মাত্র সাড়ে চার ফুটের সেদিকে ছেলে এখন ই তাঁর মাথা থেকে খানিক লম্বা হয় গেছে!

 

অটল – পটল উপাখ্যান – II

ছেলে’কে নিয়ে চিন্তা করতে করতে ই অটল অফিসের পথে রওনা হলেন…স্ত্রী নিত্য কালী ভাত খেতে বসার সময় স্বামী’কে চুপ চাপ দেখে কারণ জানতে চেয়ে ছিলেন – `মাস্টার ও রকম ঝড়ের বেগে চ্লে গেলেন কেন গো?’ সংক্ষেপে অটল জানালেন – `উনি আর পটল কে পড়া’তে পারচ্ছেন না, তাই’ …ঘটনা’র গুরুত্ব না বুঝে সোজা স৅প্টা মানুষ নিত্য কালী ছেলে’র প্রতি অপত্য স্নেহে বলে উঠেছেন – `কতো বুদ্ধি আমাদের ছেলেটা’র! তুমি তাহলে একটা নতুন মাস্টার দেখে দাও’. শুধু `হুঁ’ বলে চ্লে এসেছেন…কাজের মধ্যে মধ্যে এই চিন্তা তাঁকে শান্তি’তে থাকতে দিচ্ছে না…`কী হবে ছেলেটা’র কপালে?’ তাঁর নিজের থেকে ছেলে পড়ানো সম্ভ্ব না…তিনি কী করেন! এই তো মাস খানেক আগের কথা; এক সকালে দাড়ি কামা তে সবে বসেছেন, ছেলে খাতা নিয়ে হাজির – `বাবা, এই অঙ্ক তিনটে একটু বুঝিয়ে দেবে?’

 

মনে মনে `কালী কালী’ স্মরণ করে অটল হাত বাড়িয়ে ছিলেন – `দাও দেখি’…প্রথম টা তে `এক টা বাঁশের এত ভাগ জলে, এত ভাগ কাদা’য় আর বাকিটা 2 মিটার হলে পুরো বাঁশ টির দৈর্ঘ্য কত?’ এক মুহুর্তে অটল’এর মাথা ঝিম ঝিম করে উঠে ছিল; যেন বাঁশ টা পুকুর থেকে স-বেগে তাঁর মাথা’য় সোজা এসে পড়েছে! যা ঘিলু টিল্যূছিল, সব বাইরে পড়ে আছে..

 

অটল – পটল উপাখ্যান-III

…মুখে অবিচলিত ভাব বজায় রেখে 2 নংঅঙ্ক’এর দিকে তাকালেন – `বাবা ও ছেলে’র বয্স ‘এর যোগ ফল এত বছর…5 বছর আগে সেটা এত ছিল…দু জনের বরতমান বয়স কতো হবে?’

প্রচুর সময় ব্যয় করে টাকের ঘাম মুছে তাঁর হাতে এই উত্তর এল : – বাবা’র বয়স 22, ছেলে’র 58! `এই তো, সহজ ছিল এটা’ বলে পটলের দিকে খাতা তা বাড়িয়ে ধরলেন…পটলের মুখে একটা কিন্তু কিন্তু ভাব ফুটে উঠে ছিল – `বাবা’র থেকে ছেলের বয়স যে বেশি দেখাচ্ছে’? সেটা অট্ল নিজেও দেখে ছিলেন কিন্তু করেন আর কী? তাই ছেলে’কে আস্বস্ত করতে বলে ছিলেন – `তাতে কী হএছে, অংকের বাবা তো, আসল বাবা তো নয়’ বলেই আর এক মুহুর্ত সময় না বসে স্ত্রী নিত্য কালী’র উদ্দেশে `কই গো, হল রান্না তোমার, আমার অফিসে’র দেরি হয় যাচ্ছে’ বলেই বাথরুমের দিকে দৌড় লাগিয়ে ছিলেন…

এভাবে আর কতো এড়াতে পারা যায়…হাফ-ইয়ারলি’র রেজাল্ট ততো ভালো কিছু হয় নি পটলের; মাঝে এক দিন অধ্যক্ষ হেরাল্ড বেনেট এর অফিস থেকে উনার কাছে চিঠি ও এসে ছিল…স্ত্রী’কে সেটা তিনি জানান নি…জানা গেছে যদি পটলের পড়া-শোনা এভাবেই চ্লে, বাত্সরিক পরীক্ষা তে সে পাস করা প্রায় অসম্ভব হয় যাবে…একমাত্র সন্তআন, ছেলে’কে যথাসাধ্য আদর দিতে কোন কার্পণ্য করেন না, নিত্য কালী’র তো কথাই নেই…স্কুলের অফিস থেকে আরও কিছু কথা তাঁর কানে এসেছে – মাঝে মধ্যে পটল কে স্কুল চলা’র সময় বাইরে ঘুরতে’ও দেখা যাচ্ছে…ওর ই এক সম বয়সের সহ পাঠই বংশী’র সঙ্গে…ছোট বয়সে একটু আধ-টু দুষ্টুমি সবাই করে তাহলে ও ঘটনা’তা উনি একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেন নি…শুনে অটলের একটু ও ভালো লাগে নি…তাই ঘরে পড়ানো’র মাস্টার ও ঠিক এমন মোক্ষম সময় ছেড়ে চ্লে যেতে নিজেকে দিশে হারা আর অসহায় বোধ কর ছিলেন অটল

 

অটল – পটল উপাখ্যান-IV

কম কষ্ট করে অটল ছেলে’কে এই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভ্র্তি করতে পেরে ছিলেন! সাধারণত ওরা ছাত্র নেবার আগে বাবা-মা দুজনের’ই সঙ্গে কথা বলে দেখে; উনি একাই গিয়ে ছিলেন; প্রিন্সিপাল’এর কামরা’তে দুরু দুরু বুকে ঢুকেছেন; টেবিলের কাছে গিয়ে ভ্দ্র্লোকের মুখে’র দিকে তাকিয়ে তিনি হ্তভম্ব! এ তো তাঁর ছোট বেলা’র স্কুলের পরিচিত – হারাধন বারুজ্যে?? তাহলে দরজাতে যে `হারোল্ড বেনএট’ লেখা আছে! তিনি `হারাধন তুই…’ সবে মুখে উচ্চারণ করেছেন, তাড়াতাড়ি ভদ্রলোক মুখে আঙ্গুল তুলে ইশারা করলেন চুপ করতে…উঠে এসে নিজের হাতে কামরা’র দরজাটা বন্ধ করলেন…তার পরে অটল কে হাত ধরে সামনের সোফা’তে বসিএ নিজেও পাশে বসলেন…ক্রমে অটল জানলেন যে সত্যই উনি তাঁর ছোটো বেলা’র সেই পরিচিত হারাধন! কিন্তু এখানে ওই নাম অচল – ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে হারাধন নাম নিয়ে বসলে কেউ পাত্তআই দিত না, তাই নাম পাল্টে `হারল্ড বেনেট’ হতে হয় ছে…`এ সব কথা যেন জানা জানি না হয়, আমি খুব বড় কন্সেসন দিয়ে তোমার ছেলে’র সব ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি’…তোমার কোন রকমে অসুবিধে হবে না’ …বস্তুত সেটাও একটা কারন যে পটল  এর নাম এখনও স্কুলের খাতায় আছে কিন্তু এভাবে আর কত দিন চলবে?

এদিকে অটল চাঁদ যতক্ষণে ছেলে আর অফিস নিয়ে নানা ভাবনা চিন্তা’য় ব্যাস্ত, পটল তার প্রাণের সহ পাঠই বংশীর খোঁজে বেড়িযেছে…

 

 

অটল – পটল উপাখ্যান-V

…তাদের’ই পাড়া’য় একেবারে পেছ্নের দিকে বংশীর বাড়ি, মানে তার বাবা’র ছোটো কোয়ার্টার…বাড়িতে পটল কখনও যায় নি…শুধু কথা প্রসঙ্গে জানে যে তার ছোটো ছোটো ভাই বোন আছে আর মা’ও.. .স্কুলের মাঠ’ এতেই তাদের দেখা শোনা, বাড়িতে কখনও যাবার দরকার তো হয় নি…কিন্তু তিন দিন পার হচ্ছে আজও সে আসে নি কেন, জানতে পটল অধীর হয় পড়েছে…এমন টা তো বড় একটা হয় নি! খুঁজতে খুঁজতে সে প্রায় অচেনা দিকে এসে পড়েছে,  আসে পাশে যত দেখছে সে, খালি গায়ে মলিন, রং চটা বা একেবারে ছেঁড়া জামা পরা বাচ্চা বা ছেলেরা, তার মতো মা’এর  হাতে যত্ন করে কাচা ইস্ত্রি করা ধপ্ ধপে স্কুলের পোষাক তো কারো গায়ে নেই…একেবারে অচেনা জায়গাতে নিজেকে কেমন যেন অসহায় বোধ করছিল এবারে পটল…অসহায় আর কেমন যেন বে -মানান…কোথায় বংশী? মরিয়া হয় একটু বযস্ক এক জ্ন কে দেখে এবারে তার কাছেই বংশী’র বাড়ি’র রাস্তা জানতে চাইল…লোক টা কেমন একটা অদ্ভ-উত্ ভাবে ওর দিকে তাকাল, তার পরে মুখে কিছু না বলে ডান হাত খানা দিয়ে গলি’র শেষে’র কোণে’র বাড়ি’টা দেখিয়ে দিল…প্রায় এক দৌড়ে পটল সেখানে পৌঁছে গেছে, দরজাতে অধীর ভাবে জোরে কড়-আ ধরে নেড়েছে…একটু বাদেই দরজাটা খুলে গেল; যে খুলল, তার মুখ দেখে পটল বিস্ময়ে হত বাক্! এ তো বংশী! কিন্তু এ কী চেহারা হযেছে তার বন্ধউ’র! চোখ কান্নায় ফোলা, চুল উসকো-খুস্কো…বংশী নিজেও পটল কে দেখে ভারি অবাক হয় গেছে – প্রথম পটল ই কথা বল্ল – `কী রে বংশী, তিন দিন হয় গেল, স্কুলে আসিস নি কেন’? বংশী’র উত্তর আস বার আগেই ভেতর থেকে মেয়েলি গলা তে চাপা কান্না’র শব্দ ভেসে এল…চট করে পটলে’র হাত খানা নিজের হাতে চেপে ধরে নিয়ে বংশী `বাইরে চ’ বলে দরজাটা পেছ্নে ভেজিয়ে দিল…অবাক পটল কিছু বল বার সুযোগ পেল না…

 

অটল – পটল উপাখ্যান – VI

বাড়ি’র সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু স্থানীয় কৌতুহলী মানুষের ভিড় ঠেলে বংশী পটলের হাত ধরে একটু খালি জায়গাতে এসে দাঁড়াল…ততো ক্ষণে সন্ধ্যা প্রায় নেমে এসেছে কিন্তু ল্যাম্প পোস্টের খানিক আলো আছে সেখানে…পটল বংশীর হাত’টা অধৈর্জ্য হয় একটু ঝাকুনি দিল – `বল না বংশী, স্কুলে আস্ছিলি না কেন?’ খুব ক্লিষট গলা’তে ধীরে ধীরে সে উত্তর দিল – `আমার বাবা হঠাত্-ই মারা গেছেন, কারখানা’তে আকসিডেন্ট হএ ছিল, ওরা হাস পাতালে নিয়ে গিয়ে ছিল, কিন্তু বাবা বাঁচেন নি’….একটু চুপ করে নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করতে করতে বংশী বলল – `আমার আর পড়াশোনা হবে না রে, পয়সা জোগাড় করতে হবে, আমাদের কেউ দেখা’র নেই, ওই কার খানা’এ মজুর’এর চাকরী যাতে পাই, চেষ্টা করছি…বাড়িতে একটু পয়সা নেই, ছোটো  ভাই বোন গুলো কী খাবে, জানি না…কত পয়সা তখন নষ্ট করেছি রে’…বংশী চোখ মুছতে লাগল হাতে’র চেট-ওর উল্টো দিকে…পটলের গলা তখন কান্নায় বুজে আসছে – `সত্যই তুই আর আসবি না রে স্কুলে?’ কোন মতে সে শুধু এই টুকু প্রশ্ন করতে পারে…বংশী আস্তেআস্তে মাথা নেড়ে `না’ বলে…পটল তার পকেটে হাত ঢোকাল, যা টাকা পয়সা হাতে ওঠে, সব মুঠো করে বংশী’র হাতে গুঁজে দেয়…আজ সকালে মা নিত্য কালী যখন টিফিন কৌটা আনতে গিয়েছিলেন, সে তার জন্ম দিনের পাওয়া বেশ কিছু জমানো টাকা-পয়সা পকেটে ভরে নিয়ে ছিল…আগেও সে এ রকম করেছে, স্কুল পালিয়ে, ক্লাস পালিয়ে বংশী’র সাথে ঘুরেছে খেয়েছে…তা বংশী হঠাত হাতে এত গুলো টাকা পেয়ে অবাক হএ তাকিয়ে থাকে…পটল আর কিছু বল বার সুযোগ না দিয়ে `আসছি রে বংশী, ভালো থাকিস্, দরকার হলে আমায় জানাস্’ বলতে বলতে পেছন ফিরে হাঁটা দেয়…হাঁটা নয়, দৌড় বলাই ভালো…অনেক দেরী হয় গেছে তার বাড়ি ফেরার জন্য…

 

অটল – পটল উপাখ্যান – VII

…এদিকে রোজ কার মতো অটল সন্ধ্যে বেলার মুখো মুখি বাড়ি’তে এসে সবে ঢুকতে যাচ্ছেন, নিত্য কালী প্রায় হাঁউ-মাউ করে ছেলে পটলে’র ফিরতে দেরী হবা’র কথা তাঁকে জানিয়েছেন…পেছনের দিকের দরজাটা’ই বেশি ব্যাবহার করেন অটল, সামনের দিক দিয়ে ঢুকতে গেলে অনেক টা বেশি হাঁটতে হয় বলে…ক্লান্ত শরীরে বসতে সুযোগ পাওয়া তো দুরের কথা  ব্যাগ টা হাত থেকে নামা ‘নোর সুযোগ তখনো হয় নি, শুনে তো তিনি অবাক! …এ রকম তো আগে কখনও হয় নি…কা’কে প্রশ্ন করবেন, কোথায় খোঁজ করতে যাবেন, ভাবতে ভাবতে পেছনের দরজাতে আওয়াজ…দু জনা’ই ঘুরে তাকিয়ে দেখেন – পটল ঢুকছে!! কিন্তু এ কী চেহারা হএছছে ছেলের, চোখ কান্নায় ফোলা, মাথা’র চুল উসকো-খুস্কো

কোনো কথা বলবার আগে পটল সোজা একেবারে অটলের পায়ে’র ‘পরে উপু ড় হয় পড়এছে -`বাবা, আমি এবার থেকে ভালো ছেলে হবো, পড়আ শোনা মন দিয়ে করব, কথা দিচ্ছি, বংশী’র বাবা’র মতো তুমি…’ কথা শেষ না করে ছেলে এবার কেঁদে ফেলে…নিত্য কালী হত্ভম্ব, অটল হতবাক্!

বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে অটল নিচু হএ ছেলে’কে জোর করে উঠিয়ে দাঁড় করালেন…পটল কাঁদছে তখনো…`সত্যি বলছি বাবা, আমি তোমাদের কথা সব শুনব’…ছেলেকে এবার শান্ত করবার প্রচেষ্টা’য় মাথা’য় হাত বুলিয়ে প্রশ্ন করেন – `কী হএছে বংশীর বাবা’র?’ কোন মতে উত্তর এল – `তিন দিন আগে কার খানা’য় দুর্ঘটনা’য় মারা গেছেন হঠাত্ করে’…

ব্যাপার টা এবারে খানিক বোধগম্য হলো…`তুমি কী গিয়ে ছিলে সেখানে?’ বাবা’র প্রশ্নের উত্তরে পটল মাথা নেড়ে সম্ম্তি জানায়…তার বুকের মধ্যে এতক্ষণের জমে থাকা কথা তোড়এ বেরিএ এল `বংশী খুব কাঁদছিল বাবা, ওর মা’ও, ওদের খাবার পয়সা নেই…ও আর স্কুলে পড়তে আসবে না বাবা’ ফুঁপিয়ে উঠে জানাল পটল বংশী দুঃখ করছিল কত পয়সা আমরা দুজনে নষ্ট করেছি…আর এমন কখনও করবো না…আমি ভালো হবো বাবা, দেখো তোমরা’

ছেলে’কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এ বারে মুখ হাত ধুয়ে পরিষ্কার হয় আসতে বাথরুমে পাঠালেন অটল; নিত্য কালী তার ঘরে পরবার জামা কাপড় গুছিয়ে দিয়ে এসে স্বামী’র দিকে স-প্রশ্ন চোখে তাকালেন…অটলের মুখে স্বস্তির মৃদু হাসি – `আমাদের ছেলে বুঝতে শিখেছে, ভালো হবে কথা দিয়েছে, আমাদের আর দুশ্চিন্তআ থাকবে না’…মা’এর সহজ বিশ্বাসে নিত্য কালী জোর দিয়ে সায় দিলেন `নিশ্চয়ই তাই হবে আমার পটল, তুমি দেখে নিও’

 

(স্মৃতি’র অনু লেখন সমাপ্ত)

 

 

My Walk Around Riccarton Bush

One day I went to Riccarton Bush; I myself found it amazing that after spending so many years very much in this city, I went there only recently; though many a times I tried but some fete or weekly market or similar events were there most of the time. Or, we would find endless queue of cars all around thus parking a very difficult option, so got to come back.

This time I was lucky. It was a clear summer day with gentle breeze. I went at first along the canal, watched different types of birds, big old trees and likely things; tried to glance through details in the journal of the grand old lady – Jane Dean who was so meticulous about every details of various exotic plant species in and around her manor. Then I noticed there was something inside a big fenced area. The fencing was in itself quite ominous one; so I got curious and thought of peeping in; I got to enter via a bank strong room sort of entrance with double door protection system. One got to be careful while entering or exiting from that `booth’ type entry point, as doors do not simultaneously open. To open one, the other one got to be properly shut. On the face those `thud’ sounds of door closure might appear a bit daunting, but as one enters via those two doors, and beyond that point, it was surreal – `এ কী দৃশ্য দেখি অন্য / এ যে বন্য এ অরণ্য / হেথা দিনেতে অন্ধ কার / হেথা নিজ্জঝুম চারি ধার / হেথা উর্ধে উঁচায় মাথা দিল ঘুম / যত আদিম মহা দ্রুম্’ I have had never thought of coming across such a huge number of old ancient trees, shrub and other species – in short a lively and vibrant and beautiful forest just in the middle of our city of Christchurch! Many a people had been this Riccarton bush but I have never heard of this protected special patch of old coastal plain forests so nearby; it was hardly 20 – 25 min walk from starting point to the finish, but it was worth every single moment of it. At times those bushes were so dense and thick that hardly sunshine was able to seep through. At times it reminded one about those pristine forest tracks found along the great Greymouth region of this South Island, bush near Punakaiki region. Or, I was thinking of our days at the Rajaji National Park under once famous Lansdowne Forest Division, specifically known as Chilla Forest. On these last two, I will come back in details later

What Amazes Me About New Zealand (A Series)

What Amazes me in New Zealand:

1. Akaroa and its surroundings:-

…surrounding hills and valleys with various shades of green – light, dark, brownish in the bushes and valleys, farmlands with sparkle of aqua-marine from the vast sea behind…so many times I have been to this place…yet I do love watching those various shades of colours of Mother Nature’s own hand spun fabric of marvellous colours…

2. Timaru Botanical Garden & its surroundings

I love that long drive, sea coast, walk around the Botanical Garden. I was awed finding a much knotted Elm tree and standing under it; it was as if I was watching big pythons entwined around otherwise harmless old tree. Never had watched such peculiar sort of branch coiling before. The pond had lotus like pink coloured flowers and broad leaves, reminding me of my childhood days when at times I used to visit Eden Garden in company of my Parents and two other siblings, I tried once to pick up one lotus flower from water and got restrained by my elder brother. He thought I might either fall in water or topple the boat’s balance. Worth going many more times

3. Lake Brunner, West Coast

I had spent more than a week in a nearby cottage some years ago; the first word comes to my mind thinking about West Coast in general and Lake Brunner in particular, is GREEN. Such beauty of lush green natural bush and forest is something unique even in this beautiful country

4. Lake Hawea, Wanaka
5. Motueka
6. Lake Tekapo

In Memory of a Famous Personality: Sri Nalini Kanto Sarkar

শ্রী নলি নী কান্ত সরকার স্মৃতি চারণ

প্রথম ঘটনা:-

শ্রী অরবিন্দ আশ্রম…সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্রে’র মধ্যে সাজ সাজ একটা ব্যাপার…গ্রামোফোন কোম্পনি থেকে সাহানা দেবী ‘র কিছু গান রেকর্ড করে নিয়ে যাবে…সেই মতো সবাই প্রস্তুত…টান টান একটা চাপা উত্তেজনা বসে থাকা বাচ্চা ‘দের মধ্যে…কিছু গান `সোলো’ রেকর্ড হবে, বাকি গুলো `কোরাস’; তাই তারা ও এসে বসে আছে…সব ক’টা জানালা বন্ধ করে বড় বড় কার্পেট ঝুলিয়ে দেয়া হযেছে…বাইরের শব্দ যেন ঢুকতেনা পারে…সেই সময় `সাউনড প্রূফ’ কর বার জন্যে এই ব্যাবস্থা ই নেয়া হত…যাক সে কথা…দরজা দিয়ে প্রথমে সাহানা দি ঢুকচ্ছেন, পেছন পেছন ন্লিনী দা…তাঁর দুই হাতে তবলা ধরে…ঘর ঢুকে পুরনো কার্পে ট গুলো থেকে বেরুনো বিচ্ছিরি সোদা গন্ধএ সাহানা দি নাক কুঁচকে বলে উঠেছেন – `ইস,! কার্পে ট ‘এর গন্ধে টেঁকা দায়’…সঙ্গে সঙ্গে ন্লিনী দা বলে উঠলেন – `বিশ্বাস কর, অন্তত আমার পেটের গন্ধে নয়’….সমস্ত ঘরে চাপা একটা হাসি’র রেশ ছড়ইয়ে গেল…স্তমভিত সাহানা দি বকুনি দিলেন – `কী হচ্ছে, বাচ্চারা বসে আচ্ছে না?’

* * * * *

ঘটনা নং দুই:

স্থান সেই শ্রী অরবিন্দ আশ্রম, পনডিচেরি…একটি গানের অনুষ্ঠান হবে, অনেকে এসে বসে আছেন…এক নতুন আসা সাধক সমবেশে ঢুকেছেন…ইনি ও মাঝে মাঝে বাচ্চাদের গান শেখানোর ক্লাস নিচ্ছেন…তাঁকে দেখেই ন্লিনী দা বলে উঠেছেন – `কী হে, আজ কাল শুনি তুমি তোমার ছাত্র ছাত্রী ‘ দের দিয়ে গা – টেপাচ্ছ, পা – টেপাচ্ছ?’ সভার মাঝে একটা মৃদু গুঞ্জন শুরু হল; সাধক টি তো হ্তবাক্. তিনি কোনোমতে বলতে পেরেছেন – `দাদা, আপনি আমার গুরু জন, আপনি এমন কথা বল্ছেন’! ন্লিনী দা আবার বলে উঠেছেন – `আরে আমি নিজের কানে শুনেছি’. উপস্থিত যাঁরা ন্লিনী দা’কে ভালো মতো চেনেন, তাঁরা কিছু টা এবারে আন্দাজ করতে পেরে হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন সাধক টির তখন চোখে জ্ল আসার উপক্রম হএছে…ন্লিনী দা সরবে এবারে বললেন – `আরে বাবা, কেন তুমি কে ও দের গান শেখাতে গিয়ে `গা- টিপ তে, পা-টিপ তে বল না? আমি তো সে কথাই বলছিলাম’…সবার মধ্যে হাসা হাসি…সাধক টি স্বস্তি’র নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে এসে ন্লিনী দা’র পায়ের ধুলো নিলেন

** ** ** ** **

ঘটনা নং তিন :-

ন্লিনী দা’র উপস্থিত বুদ্ধি আর মজ আ করবার আরেক টি ঘটনা’র উল্লেখ করে এই স্মৃতি চারণ শেষ করছি…ইনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ও ভালো ভাবে তালিম নিয়ে ছিলেন আর রবীন্দ্র সঙ্গীত ভালো গাইতে পারতেন…রবীন্দ্র নাথ এর গান সম্পর্কে ইনি খুব উঁচু ধারণআ পোষন ক্র্তেন…এ বিষয়ে তর্ক’এ নামতে ইনি পিছ-পা হতেন না…একবার এক গানের জ্ল সা’তে এক ত্দ-কালীন উস্তাদ এর সঙ্গে তাঁর ম্তনৈক্য ঘটে. উস্তাদ টি বারে বারে রবীন্দ্র সঙ্গীত এ কারু কার্য কিছু নেই, শুধু কথা, ও গান তো যে কেউ গাইতে পারে – এ সব বলে যাচ্ছিলেন…ন্লিনী দা’ প্রথম টায় শান্ত ভাবে ওই উস্তাদ কে বোঝান যে, ভাষার সৌন্দর্যয় আর সুরের সুসম সমন্বয় কী ভাবে রবীন্দ্র সঙ্গীত কে এক অনন্য রূপ দিয়ে ছে; যার তুলনা শাস্ত্রীয় গানে কোথা ও নেই…উস্তাদ এর মুখের বাঁকা হাসি ত্খনো দেখে এবারে তাঁকে চ্ম্কে দিয়ে একটি ধ্রূপদ গান শুরু করেন…মুনসিয়ানা’র বা গলার কারুক্ৃতি’ এর কোন খুঁত সে গানে ছিল না, বেশ মাথা দুলিএয় উস্তাদ গান টি শুনে যান…শেষে ন্লিনী দা তাঁকে প্রশ্ন করলেন – `আমি কী গেয়েছি আপনি বুঝতে পেরে ছেন?’ `নিশ্চয়ই, তুমি একটি ধ্রূপদ গেয়েছ, আর মান তেই হবে, যে তুমি বেশ ভাল গেয়েছ’…এবারে প্রশ্ন – `আমার আলাপ চারি’তে কী ভাষা ছিল, তা বুঝতে পেরে ছেন?’ উস্তাদ’কে স্বীকার করতেই হল যে তা তিনি পারেন নি…এবারে তুরুপের তাস ছাড়লেন ন্লিনী দা -` আমি সুর তাল সব অবিকৃত রেখে এটা বলেছি “শালার ব্যটা শালা তুই আমার কী করতে প৅রিস?’ স্বভাব তঃ উস্তাদ এর মুখ তখন লাল রঙ্ এ চ্ছেয়এ গেচ্ছে…একটু ও না ঘাব্ড়এ গিয়ে ন্লিনী দা বলে গেলেন -`এটা থেকে প্রমান কী হচ্ছে না, যে ভাষা’র মধুরতা গানের সুন্দরতা কে বাড়ি এ তোলে? যেটা রবীন্দ্র সঙ্গীত’ এর বিশ্েষত্ব? যেটাআপনি মানতে রাজী হচ্ছিলেন না?’ উস্তাদ এর মুখে তখন আর কথাটি নেই!